টাইমলাইনভারত

স্বাধীনতার কয়েকদিন আগেই ডুবে যায় ভারতের “টাইটানিক”, প্রাণ হারান ৬৬৯ জন! জানেন সেই ইতিহাস?

বাংলা হান্ট ডেস্ক: ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল, ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে একটি জাহাজ কয়েকশ যাত্রীকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। যেটির নাম ছিল টাইটানিক (Titanic)। যদিও, গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয় ওই অভিশপ্ত জাহাজটি। এমনকি, টাইটানিকের ডুবে যাওয়ার ওই মর্মান্তিক ঘটনাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামুদ্রিক দুর্ঘটনা হিসেবেও পরিচিত। যদিও, টাইটানিকের মতই আরও একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল ভারতের S.S Ramdas জাহাজের সাথে। যেটিকে “ইন্ডিয়ান টাইটানিক দুর্ঘটনা” হিসেবে মনে রেখেছেন কেউ কেউ। তবে, এই দুর্ঘটনার প্রসঙ্গটি অনেকেই জানেন না। যেটিতে মৃত্যু হয় কয়েকশ মানুষের। বর্তমান প্রতিবেদনে আমরা সেই প্রসঙ্গটিই উপস্থাপিত করব।

S.S Ramdas স্কটল্যান্ডে তৈরি হয়েছিল: ১৯৩৬ সালে, রানি এলিজাবেথের জাহাজ নির্মাণকারী সংস্থা সোয়ান এবং হান্টার স্কটল্যান্ডে এই জাহাজটিকে তৈরি করে। ৪০৬ টন ওজনের জাহাজটির দৈর্ঘ্য ছিল ১৭৯ ফুট এবং প্রস্থ ছিল ২৯ ফুট। S.S Ramdas জাহাজটিতে ১০০০ জন যাত্রী সওয়ার হতে পারতেন।

সাধুদের নামে জাহাজ: এই প্রসঙ্গে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ হিসেবে জাতীয়তাবাদীরা ব্রিটিশ শিপিং কোম্পানিগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে কঙ্কন উপকূলে একটি “সুখকর বোট সেবা” শুরু করেছিল। পরবর্তীতে এটি ভারতীয় সমবায় স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি নামে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এই কোম্পানিই রামদাসকে কিনে নেয়। এদিকে, এই কোম্পানির প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অনুরাগ দেখে কোম্পানিটি তার জাহাজগুলিতে সাধু ও দেবতাদের নাম দিয়ে দেয়। এমতাবস্থায়, রামদাস ছাড়াও এই কোম্পানির জয়ন্তী, তুকারাম, সেন্ট অ্যান্টনি, সেন্ট ফ্রান্সিস, সেন্ট জেভিয়ার নামেরও জাহাজ ছিল।

সেই দুর্ভাগ্যজনক দিন: ১৯৪৭ সালের ১৭ জুলাই, দেশের স্বাধীনতার মাত্র কয়েকদিন আগে অমাবস্যার দিনে সকাল ৮ টায় S.S Ramdas মুম্বাইয়ের জনপ্রিয় ভাউ চা ধাক্কা থেকে রেওয়াস যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। এদিকে, ওইদিন গাতারি উৎসব উপলক্ষ্যে ছুটির কারণে সাধারণ দিনের তুলনায় ভিড়ও ছিল বেশি। পাশাপাশি, সাধারণ যাত্রী ছাড়াও ওই জাহাজে জেলে ও ব্যবসায়ীরাও উঠেছিলেন। এছাড়াও, কিছু ব্রিটিশ অফিসারও তাঁদের পরিবারসহ জাহাজের উপরের ডেকে উপস্থিত ছিলেন।

এই প্রসঙ্গে একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা গিয়েছে যে, ওই দিন জাহাজটিতে মোট ৭৭৮ জন উপস্থিত ছিলেন। যাঁদের মধ্যে ৪৮ জন খালাসি, চারজন কর্মকর্তা, ১৮ জন হোটেল কর্মী এবং ৬৭৩ জন যাত্রী ছিলেন। এছাড়াও জাহাজে আরও ৩৫ জন যাত্রী ছিলেন যাঁরা বিনা টিকিটে ভ্রমণ করছিলেন।

পরিষ্কার আবহাওয়া সত্ত্বেও বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়: ১৭ জুলাই আবহাওয়া সম্পূর্ণ পরিষ্কার ছিল। ওয়ার্ফ সুপারিনটেনডেন্টের বাঁশির পর, S.S Ramdas তার শেষ যাত্রা শুরু করে। ৮ টা ৩৫ মিনিট নাগাদ জাহাজটি মুম্বাই থেকে প্রায় ৭.৫ কিমি এগিয়ে যায়। এদিকে, পরিষ্কার আবহাওয়া থাকা সত্ত্বেও, একটা সময়ে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়ে যায় সেদিন। সাথে উত্তাল হয়ে ওঠে সমুদ্র। প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কায় গতি স্তব্ধ হয়ে যায় Ramdas-এর। এমনকি, বিপদ বুঝতে পেরে যাত্রীরাও আশঙ্কিত হয়ে পড়েন।

ঢেউয়ের তাণ্ডব সহ্য করতে পারেনি Ramdas: একটা সময়ে গলস দ্বীপের কাছে পৌঁছনো Ramdas প্রবল ঢেউয়ের ধাক্কা সামলাতে না পেরে পুরোপুরি উল্টে যায়। যদিও, জাহাজে লাইফ জ্যাকেট মজুত থাকলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। সকাল ৯ টা নাগাদ এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় জাহাজটি। যদিও, বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কেউ এই দুর্ঘটনার খবর পাননি। মূলত, তৎকালীন সময়ে কোনো বেতার ট্রান্সমিটার বা তাৎক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না। এমতাবস্থায়, সমুদ্রের মাঝখানে রামদাসের দুর্ঘটনার খবর পৌঁছতে দেরি হয়ে যায়।

বেঁচে যায় ১০ বছরের এক শিশু: এদিকে, এই দুর্ঘটনার পর জাহাজে থাকা কয়েকজন ভাগ্যবান যাত্রী লাইফ জ্যাকেটের সাহায্যে মৃত্যুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তাঁদের মধ্যে এক ১০ বছর বয়সী শিশুও ছিল। তার নাম হল বারকু শেঠ মুকাদম। জানা গিয়েছে, ওইদিন জাহাজে থাকা বেশিরভাগ যাত্রীই গিরগাঁও এবং পারেল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। দুর্ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ওই সময়ে যাত্রীদের মৃতদেহের পাশাপাশি, জাহাজটির ধ্বংসাবশেষেরও সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমতাবস্থায়, এই দুর্ঘটনার কিছুদিন পর দেশ স্বাধীন হয়। পরে মুম্বাইয়ের অদূরে এবং শহরের বন্দরের পাশে এলিফ্যান্টা দ্বীপ এবং বুচারস দ্বীপে বেশ কয়েকজন যাত্রীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই মৃতদেহগুলির মধ্যে ১৩ বছর বয়সী ফরাসি বালিকা মিস লা বাউচার্ডিয়ারের মৃতদেহও ছিল। সে তার বাবা-মা এবং ১৪ বছর বয়সী ভাইয়ের সাথে জাহাজটিতে সওয়ার হয়েছিল। যদিও, তার পরিবারের বাকিদের কোনো সন্ধান মেলেনি।

এই জাহাজটি ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি ১০ বছর বয়সী বারকু শেঠ মুকাদম হিন্দি-মারাঠি ছবির পরিচালক কিশোর পান্ডুরং বেলেকারকে সবিস্তারে বর্ণনা করেছিলেন। ২০১৮ সালে, বারকু শেঠের বয়স ছিল ৯০ বছর। তাঁর সঙ্গে ওই ডুবন্ত জাহাজ থেকে ১২ বছর বয়সী আবদুল কাইসও বেঁচে যান। তিনি ৮৯ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় জাহাজে কয়েকজন গর্ভবতী মহিলাও উপস্থিত ছিলেন।

Related Articles