টাইমলাইনপশ্চিমবঙ্গবিশেষরাজনীতি

পুলিশ সেজে কারা মারল ছাত্রনেতা আনিসকে! উত্তর নেই খোদ পুলিশের কাছেও

বাংলাহান্ট ডেস্ক : বিনা মেঘে বজ্রপাত। রাতারাতি সারা জীবনের মতন না ফেরার দেশে চলে গেল বছর ২৮ এর তরতাজা একটা প্রাণ। পড়ে রইল বইপত্র আর বাকি থাকা সমস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে দিন বদলের স্বপ্ন দেখা ছেলেটাই হারিয়ে গেল কালের অতলে।

বাগনান কলেজে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে কলকাতার আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন আনিস খান। আমতার দক্ষিন খাঁ পাড়ার বাসিন্দা বরাবরের লড়াকু ছেলেটা কলেজ জীবন থেকেই যুক্ত ছিলেন ছাত্র রাজনীতিতে। সক্রিয় বাম রাজনীতিতে সামনের সারির মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েও জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনৈতিক কর্মকান্ডে। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টে যোগও দেন তিনি। কিন্তু কাল হল এই রাজনীতিই। সিএএ-এনআরসি আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা ছেলেটার প্রাণ কাড়ল রাজনৈতিক চক্রান্ত। নিজের বাড়ির ছাদ থেকে ফেলেই খুন করা হল তাঁকে।

শুক্রবার ভোর রাতে আনিসের বাড়িতে পুলিশের পোষাকে হানা দেয় চারজন। তারাই খুন করে আনিসকে। আনিসের দাদা জানিয়েছেন, ‘রাতে যারা এসেছিল তাদের একজনের পরণে ছিল খাকি পোষাক। আগ্নেয়াস্ত্রও ছিল সঙ্গে। বাকি তিনজন ছিল সিভিক ভলেন্টিয়ারের ড্রেস। ওই চারজন এসে বলে বাগনান কলেজের একটি কেসে আনিসের নাম ছিল। চার-পাঁচ বছরের পুরোনো সেই মামলায় আনিস জামিন নেয়নি। বাগনান থানা আমতা থানার উপর চাপ দিচ্ছে, তাই তারা এসেছে।’

পরিবার সূত্রে দাবি, বহু ধাক্কাধাক্কির পর দরজা খুলে দেন আনিসের বাবা। আনিস তখন তিনতলার ঘরে ছিলেন। পুলিশ বেশে ওই চারজন দাবি করে তাদেরকে উপরে যেতে না দিলে বিপদ হবে। তারা আনিসের সঙ্গে কথা বলতে চায়। এরপরই চারজনের মধ্যে তিনজন উঠে যায় উপরে। কিন্তু মিনিট ছয় সাতের মধ্যেই ফিরে আসে তারা। এসে নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিতে জানায় ‘স্যার কাজ হয়ে গেছে।’

এরপরই তড়িঘড়ি আনিসের ঘরে যান বাবা ও দাদা। সেখানে গিয়ে দেখা যায় সারা বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বই। কিন্তু কোথাও চিহ্ন অবধি নেই ছেলের। এরপরই ছাদে গিয়ে দেখা যায় নীচে রক্তস্রোতে ভেসে পড়ে রয়েছে ছেলের প্রাণহীন দেহ।

অভিযোগ দায়ের করা হলেও ঘটনার এখনও অবধি কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। পুলিশের দাবি গতকাল রাতে কোনো পুলিশ কর্মীই আসেননি আনিসের বাড়িতে। পুলিশের বেশে ওই চারজন কে তাও জানে না তারা। আনিসের নামে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলেও জানানো হয় থানা থেকে।

এরপরই প্রশ্ন উঠতে থাকে তাহলে ওই চারজন কারা! আনিসের এক বন্ধু জানিয়েছেন, ‘এটা রাজনৈতিক হত্যা। ঠান্ডা মাথায় খুন। পুলিশ যদি নাই এসে থাকে তাহলে পুলিশ খুঁজে বের করুক তারা কারা।’ খবর পেয়ে আনিসের বাড়িতে যান ভাঙড়ের বিধায়ক তথা আইএসএফ নেতা নৌসাদ সিদ্দিকি। কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বারণ করে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলনকে তীব্রতর করার ডাক দেন তিনি।

কেন হল? কারা করল? কোনো প্রশ্নেরই জবাব নেই কারও কাছে। কিন্তু তরতাজা ছেলের মৃতদেহ বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের বুক ফাটা কান্না সঙ্গেই মিশে একাকার হয়ে গেল ‘ভাই চলে গেল’ বলে মর্মান্তিক অসহায় আর্তি।

শনিবারই এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন আনিসের সহপাঠী এবং সহযোদ্ধারা। দোষীদের শাস্তির দাবিতে রীতিমতো রণক্ষেত্রের আকার নেয় পার্ক সার্কাস। এদিন আনিসের জন্য ন্যায় বিচার চেয়ে পার্ক সার্কাসে মিছিল করেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা। কিন্তু সেভেন পয়েন্ট ক্রসিং অবরোধের চেষ্টা করলে বাধা দেয় পুলিশ। রীতিমতো পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় আন্দোলনকারীদের। ঘটনার জেরে উত্তপ্ত পার্ক সার্কাস চত্ত্বর।

Related Articles