টাইমলাইনপশ্চিমবঙ্গ

সত্যিকারের ভালবাসা: ২০০ কিমি পায়ে হেঁটে পরিবারের কাছে ফেরা! চোখের জল ধরে রাখতে পারল না গাড়ি চালক

বাংলাহান্ট ডেস্কঃ পরিবার ছেড়ে থাকাটা যে কি কষ্টকর তা যারা ছেড়ে থাকে তারাই জানে। আর নিজেকে লড়াই করে বাঁচিয়ে রাখা মানেটা বাঁচার শেষ লড়াই বোধহয় একেই বলে। মাইলের পর মাইল, হাজার হাজার লোক হেঁটে চলেছে। শুধুমাত্র নিজের আস্তানায় ফিরবে বলে। গত কয়েক দিন ধরে আমাদের দেশের এক চেনা এমনই। সেই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা উঠে এল পেশায় গাড়িচালক(car driver)  দিল্লির (delhi) এক বাসিন্দার দীপকের (Dipak) মুখে। তিনি বললেন, ‘‌আমি একজন গাড়িচালক। কয়েকদিন আগে আগ্রা গিয়েছিলাম একজনকে ছাড়তে। কিন্তু তার পরেই হঠাৎ লকডাউন (lockdown) ঘোষণা করা হয়। আমার পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়ে। আমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো দ্বিতীয় সন্তান হবে। আমার মা অসুস্থ। একটা ছোট্ট মেয়ে আছে। ওদের দেখভাল করার কেউ নেই। আমার কোনো উপায় ছিল না বাড়ি ফেরা ছাড়া।

corona index 2003171712 Bangla Hunt Bengali News

তাই ২৮ মার্চ রাত্রিবেলা আমি ফিরতে শুরু করলাম। রাস্তায় অনেক লোক ছিল। আমি দেখেছি, হাজার হাজার পুরুষ মহিলা। সারারাত ধরে হেঁটে ভোররাতে যেখানে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়েছেন, তাঁরা ঘুমিয়েছেন। বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প(petrol pump) গুলি ছিল বিশ্রামের জায়গা। কারণ সেখানে শৌচালয় ছিল।

আমি যখন আগ্রা থেকে বের হই তখন ভাবিনি যাত্রাপথ এত ভয়ঙ্কর কঠিন হবে। ভেবেছিলাম তিন চার ঘন্টায় দিল্লি পৌঁছে যাব। কিন্তু আমার যাত্রাপথ কয়েক দিন গড়িয়ে গেল। আগ্রা থেকে শুরু করে ৩০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর সূর্য ওঠার কিছু আগে ভাবলাম একটু বিশ্রাম করি। পেট্রোল পাম্পে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অনেকে, আমিও তাঁদের সাথে বিশ্রাম নিলাম। সকালে সবাই আবার একসঙ্গে চলতে শুরু করলাম।

lockdown corona Bangla Hunt Bengali News

সবচেয়ে বড় কথা, রাস্তায় কোনরকম সরকারি কোন সাহায্য ছিল না। শুধুমাত্র মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি দেখা যাচ্ছিল। তারা তো সাহায্য করছিলেন না বরং লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করতে চাইছিলেন এই জনতাকে। পুলিশের (police) ভয়ে আমরা বাধ্য হয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে, মাঠের ভেতর দিয়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে পথ অতিক্রম করছিলাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা কেউ খাবার দিচ্ছিলেন, কেউ জল দিচ্ছিলেন। রাস্তার ধারে লঙ্গর খোলা হয়েছিল। যদি এগুলো না থাকতো তাহলে আমরা বেঁচে বাড়ি ফিরতে পারতাম না। এত পথ হাঁটতে হাঁটতে কোন সময় না খেতে পেয়ে হয়তো মরে যেতাম।

২৯ তারিখ সারাদিন আমি প্রায় ৩০–৪০ কিলোমিটার হেঁটেছি। জোরে হেঁটে বাড়ি পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল, আমিও তাই। দেখলাম, কারওর ৩–৪ জন সন্তান রয়েছে, সবাইকে নিয়েই তাঁরা বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক দৃশ্য দেখলাম, দুধের শিশু (child) এত কম বয়সে পায়ে হেঁটে রাস্তা পার করার চেষ্টা করছে। আমার ওকে দেখে নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে গেল। একবার সন্তানের কথা মনে করলে আর কি কিছু সামলানো যায়?‌ তাই আমিও জোরকদমে ফিরতে লাগলাম। প্রায় চার দিন এভাবে অফুরান রাস্তা হাঁটার পর তারপর হয়তো নিজের পরিবারের(family) সঙ্গে আমাদের দেখা হবে, এটা ভেবেই শক্তি সঞ্চয় করছিলাম।

আমি রাস্তায় দেখেছি একজন রিক্সাচালক, তাঁর রিক্সায় দুই সন্তান এবং স্ত্রীকে বসিয়ে ফিরছেন বিহারের গ্রামে। এখান থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। বুঝতে পারছেন কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি?‌  তাঁরা ভয় পাচ্ছেন, ভেবেছেন আমরা ভূত, করোনার ভূত। সে রাতে আমি খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

lockdown kolkata Bangla Hunt Bengali News

পরের দিন আমি বেশিদূর যেতে পারিনি। দু’‌দিন পর পর হাঁটার পরে আমার পা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কেউ কেউ চপ্পল পড়ে হাঁটছিলেন। তাতে আরও পা ব্যথা যেন বেড়ে যাচ্ছিল। টানা এতটা রাস্তা হাঁটা সম্ভব?‌ ফোন করে করে কয়েকবার বাড়ির খোঁজ নিয়েছিলাম। ওরা আমাকে নিয়ে আরো বেশি চিন্তা করতে শুরু করেছিল। বারবার জিজ্ঞেস করছিল, আমি নিরাপদে আছি কিনা!‌ আমিও বারবার ওদের কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। ওরা ভয় পাচ্ছিল, আমাকে যদি মাঝ রাস্তায় পুলিশে আটকে দেয়?‌

৩০ তারিখে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার পথ চলার পর আমার আর কাজ করছিল আমি হোদালের কাছে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ মনে হল, আমি তো প্রায় বাড়ির কাছেই এসে পড়েছি।

 

৩১ তারিখ ভোরবেলা আবার শেষ পথটুকু হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু মাঝরাস্তায় পুলিশ ধরল আমায়। সে সময় আমার কথা শুনল না। আনন্দ বিহার আর গাজিপুরের কাছে পুলিশে মারও খেয়েছি। শেষপর্যন্ত পৌঁছলাম বাড়ি। হয়তো লকডাউন এর বেশিরভাগ সময় আমি পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারিনি। কিন্তু এখন আমি নিশ্চিন্ত। আমার পরিবার আমার সন্তানদের নিয়ে আমি একসঙ্গে আছি। এখন যে কোনো সংকট থেকেই আমরা লড়াই করে উঠে দাঁড়াতে পারবো।

Back to top button