বাংলাহান্ট ডেস্ক: দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব আরও বিস্তৃত করতে দীর্ঘদিন ধরেই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করতে চাইছে চিন (China)। সেই কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নেপালকে (Nepal) তিব্বতের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করা। কাঠমান্ডু থেকে তিব্বত পর্যন্ত রেল যোগাযোগ তৈরি হলে দক্ষিণ এশিয়ায় বেজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব অনেকটাই বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছিল। ভারতের (India) চারপাশে পরিকাঠামোগত যোগাযোগের একটি বলয় তৈরি করে নয়াদিল্লির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করাও এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে দাবি করেছেন কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কিন্তু সেই পরিকল্পনার পথে এবার বড় ধাক্কা দিয়েছে প্রকৃতি। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানে নেপাল-চিন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ গিরং স্থলবন্দর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিপর্যয়ে ভেস্তে গেল চিনের (China) নেপাল-তিব্বত রেল সংযোগের কৌশল:
তিব্বতের প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত গিরং স্থলবন্দরটি নেপাল ও চিনের (China) মধ্যে পণ্য পরিবহণ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে পরিচিত। প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ি এলাকায় নেমে আসা হড়পা বানের স্রোত মুহূর্তের মধ্যে রাস্তা, সেতু এবং আশপাশের পরিকাঠামোকে কার্যত ধ্বংস করে দেয়। কাদা ও ধ্বংসস্তূপে ঢেকে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতির যে ছবি দেখতে পেয়েছে, তাতে বিপর্যয়ের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে। বহু জায়গায় স্থলবন্দরের চিহ্নও খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে নেপাল-তিব্বত যোগাযোগ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিপর্যয়ের গুরুত্ব আরও বাড়ছে কারণ গিরং এলাকাকে ঘিরেই চিনের বৃহত্তর পরিকাঠামো পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছিল। পাহাড় কেটে তিব্বতের দিক থেকে রেলপথ এগিয়ে এনে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর সঙ্গে সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বেজিংয়ের। ২০১৬ সালে চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা BRI-এর আওতায় এই ধরনের যোগাযোগ প্রকল্পের কথা প্রকাশ্যে আসে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত উপস্থিতি জোরদার করাই ছিল চিনের বড় লক্ষ্য। তবে ঘোষণার পরও বহু প্রকল্প বাস্তবে ধীরগতির বা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। গিরংয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু নেপাল-তিব্বত রেলপথ নয়, চিনের আরও একটি বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়েও এই ঘটনার পর উদ্বেগ বাড়ছে। তিব্বতের নামচা বারওয়া এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে চিনের। ওই এলাকাতেই নদীটি বড় বাঁক নিয়ে ভারতের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে চিনের জলাধার থেকে জল ছাড়া, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং অতিবৃষ্টির সময় অতিরিক্ত জল নামার বিষয়টি ভারতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় ফের মনে করিয়ে দিয়েছে, পাহাড়ি অঞ্চলে বড় পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কতটা বড় হতে পারে।

আরও পড়ুন: কড়া হাতে দমন! ২০২৯-এর মধ্যেই ধ্বংস হবে ভারতের ১০০ টি ড্রাগ নেটওয়ার্ক, তৈরি রোডম্যাপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই ধরনের বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে জলবায়ু ও নদীর জলসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত আদানপ্রদান করা জরুরি। বিশেষ করে বড় বাঁধে কতটা জল জমা রয়েছে, কখন কতটা জল ছাড়া হচ্ছে এবং অতিবৃষ্টি বা হড়পা বানের সম্ভাবনা তৈরি হলে তার আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া—এই তথ্যগুলি সময়মতো জানানো হলে নিচের দিকে থাকা দেশগুলি প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায়। চিনের (China) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের তথ্য ভাগ না করার অভিযোগ উঠেছে। তাই গিরংয়ের ভয়াবহ ধ্বংসের পর বেজিং তার নীতি ও অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আনে কি না, সেটাই এখন নজরে। একইসঙ্গে নেপালের বিপর্যয় চিনের BRI-র উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাকে সাময়িক ধাক্কা দিল, নাকি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিল, তার উত্তরও সময়ই দেবে।













