দিল্লির জঙ্গলের মাঝে রাজপ্রাসাদ! আওয়াধ রাজ্যের শেষ রাজপুত্রের কাহিনি শিহরিত করবে আপনাকেও

বাংলা হান্ট ডেস্ক: আজও উত্তর ভারতে আওয়াধ রাজ্যের প্রসঙ্গ বারেবারে উঠে আসে। বর্তমানে মাত্র কয়েকজনই উত্তরপ্রদেশের রাজধানী লখনউকে এক সময়ে আওয়াধ রাজ্যের রাজধানী হিসেবে চেনেন। কিন্তু, এই রাজ্যের এক রাজপুত্রের কাহিনি অবাক করবে সকলকেই। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এলেন ব্যারি আওয়াধ রাজ্য এবং সেখানকার রাজপুত্র প্রিন্স সাইরাসকে নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে আওয়াধ রাজ্যের শেষ পরিবারটিকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছিলেন এবং বেশ কয়েক মাস ধরে প্রিন্স সাইরাসের সাথে কথাও বলেন।

এই প্রসঙ্গে এলেন জানান, “আমি আওয়াধ রাজপরিবারের কথা শুনেছিলাম। তাঁরা ছিলেন শহরের এক বড় রহস্য। তাঁদের গল্প বলতেন পুরোনো দিল্লির চা বিক্রেতা, রিকশাওয়ালা এবং দোকানদাররা। তাঁরা বলতেন, জঙ্গলের মধ্যে একটি প্রাসাদ রয়েছে। যেটি শহর থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানে একজন রাজপুত্র, একজন রাণী এবং একজন রাজকন্যা বাস করতেন। তাঁরা সকলেই মুসলিম রাজ পরিবারের সাথে সম্পর্কিত।” তখন থেকেই এলেন সেই প্রাসাদ এবং সেই পরিবারের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তবে, তিনি শুধু দিল্লি এবং উত্তরপ্রদেশেই নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ করতে লন্ডন এবং লাহোরেও গিয়েছিলেন।

এই প্রতিবেদনে, তিনি বলেছেন, “মানুষজন সর্বত্র রাজপুত্রের সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলত। কিছু লোক বলেন যে আওয়াধের এই পরিবারটি ১৮৫৭ সালের। তখন ব্রিটিশরা তাঁদের সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়েছিল। ধীরে ধীরে একটি জঙ্গল প্রাসাদের চারপাশে তৈরি হয় এবং সেটি ঘিরে ফেলে। একবার এক ব্যক্তি টেলিফটো লেন্স দিয়ে রাজকন্যার ছবি দেখে জানিয়েছিল ‘মনে হচ্ছে তাঁর চুল অনেক বছর ধরে কাটা হয়নি।'”

মূলত, চতুর্দশ শতকে নির্মিত এই প্রাসাদে ভয়ঙ্কর কুকুরও ছিল। পাশাপাশি, সেখানে লেখা ছিল, “কুকুর থেকে সাবধান। যারা ভেতরে প্রবেশ করবে তাদের গুলি করা হবে।” কয়েক বছরের মধ্যে, পরিবারটি কিছু বিদেশি সাংবাদিকের সাথে যোগাযোগ করে সরকারকে দোষারোপ করতেন। তবে সাংবাদিকরা অনেক রসদ পেতে থাকেন। ১৯৯৭ সালে, রাজকুমার এবং রাজকুমারী, টাইমস অফ লন্ডনের সাথে কথা বলার সময় বলেছিলেন যে, তাঁদের মা ব্রিটেন এবং ভারতের বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ছিলেন এবং অবশেষে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

এলেন এই পরিবার সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে জানার জন্য ক্রমাগত আগ্রহী ছিলেন। একবার তিনি ফোন পেলেন যে, যুবরাজ সাইরাস তাঁর সাথে দেখা করতে চান। মূলত, এলেন নিজেই সাইরাসের সাথে দেখা করতে চেয়েছিলেন। এরপর সোমবারের এক সন্ধ্যায় যুবরাজ দেখা করতে ডাকেন। এলেন সেখানে গিয়ে দেখেন ১৯ শতকে এখানে লাগানো গাছগুলি বিংশ শতকে ঘন জঙ্গলে পরিণত হয়েছে।

ফোনে, এলেনকে বলা হয়েছিল গাড়িটি যেখানে রাস্তা শেষ হয়েছে সেখানে ছেড়ে যেতে। এর ঠিক পাশেই ছিল মিলিটারি কম্পাউন্ডের বড় প্রাচীর। এলেন কথামত তাঁর ড্রাইভারকে দূরে দাঁড়াতে বলে অপেক্ষা করছিলেন কখন কেউ এসে তাঁকে নিয়ে যাবেন। সেই সময়েই সাইরাস সেখানে উপস্থিত হন।

সাইরাসকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল যে, তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ একাকী জীবনযাপন করছেন। এলেন যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি তাঁর সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে চান কিনা, তখন তিনি বলেছিলেন যে, এর জন্য তাঁর বোন রাজকুমারী সকিনার অনুমতি নিতে হবে। এদিকে, এলেন সেখানে বেশ কিছু ঘটনা জানতে পারেন।

জানা যায়, ১৯৭০ সালে সাইরাসের মা হঠাৎ একদিন নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশনে আসেন এবং বলেন যে তিনিই বেগম-ই-আওয়াধ। তখন এই সাম্রাজ্যের কোনো নাম-চিহ্ন ছিল না। বেগম বলেছিলেন যে যতক্ষণ না তাঁর সাম্রাজ্যের সমস্ত সম্পত্তি পুনরায় সংরক্ষণ করা হয় ততক্ষণ তিনি স্টেশনে থাকবেন। তিনি ভিআইপি ওয়েটিং রুমে থাকতে শুরু করেন।

বেগমের আচরণও ছিল অদ্ভুত। তাঁর কোনো সরকারি যোগাযোগ ছিল না। তাঁকে কিছু বলতে গেলে আগে একটি পৃষ্ঠায় লেখা হতো। তারপর সেটিকে চাকরকে দিয়ে জোরে জোরে পড়তে বলতেন তিনি।

এদিকে, তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অমর রিজভি তাঁর কাছে পৌঁছে তাঁকে অর্থ প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু, তিনি রেগে গিয়ে টাকার খামটি ছুঁড়ে ফেলে দেন।

এদিকে, এলেন ক্রমাগত সাইরাসের সাথে দেখা করছিলেন। তিনি ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। প্রিন্স সাইরাসের বোন সকিনা তাঁকে একটি বই উপহার দেন। এতে তাঁর সমগ্র জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। এসবের মাঝেই এক রাতে সাইরাস তাঁকে ডেকে জানান যে তাঁর বোন সকিনা মারা গেছে।

WhatsApp Image 2022 04 19 at 8.46.52 PM

অ্যালেন জানতে পেরেছিলেন যে সাইরাসের দুই খুড়তুতো ভাই ওয়াহিদা এবং খালেদা পাকিস্তানের লাহোরে বাস করতেন। ওয়াহিদা বহু বছর শিক্ষকতা করেছেন বলেও জানতে পারেন তিনি। সাইরাস বিশেষ কারোর সাথে কথা বলতেন না। তবে, তিনি মাঝে মাঝে প্রাসাদের কাছে অবস্থিত আর্থ স্টেশনের রক্ষীদের সাথে কথা বলতেন। ২০১৭ সালের নভেম্বরে, যখন প্রহরীরা সাইরাসকে বেশ কয়েক দিন সেখানে দেখতে পাননি, তখন তাঁরা পুলিশকে জানান। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সেখানে একটি কঙ্কাল দেখতে পায়। ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করে। তাঁর কবরের নামকরণ করা হয়েছে DD33B।

Sayak Panda
Sayak Panda

সায়ক পন্ডা, মেদিনীপুর কলেজ (অটোনমাস) থেকে মাস কমিউনিকেশন এবং সাংবাদিকতার পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স করার পর শুরু নিয়মিত লেখালেখি। ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলা হান্ট-এর কনটেন্ট রাইটার হিসেবে নিযুক্ত।

সম্পর্কিত খবর