গত ৯ বছরে ৯ টি মারাত্মক সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার, অন্য কেউ থাকলে কখনই হত না সম্ভব

বাংলা হান্ট ডেস্ক : দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৯ বছর পূর্ণ করেছেন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। গত ৯ বছরে, দুটি লোকসভা নির্বাচনেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিপুল জয় পেয়েছে বিজেপি। গত ৯ বছরে, নরেন্দ্র মোদি সরকার আর্থিক, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন অংশকে সরাসরি উপকৃত করার জন্য বহু প্রকল্পের পরিসেবা প্রদান করেছেন। প্রতিশ্রুতি পূরণের উদ্দেশ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে মোদি সরকার, যা বিরোধীদের সমালোচনার পাশাপাশি জনগণের প্রশংসাও কুড়িয়েছে।

cashless india

   

১) ডিজিটাল পেমেন্ট / ক্যাশলেশ ইন্ডিয়া : ইউনিফাইড পেমেন্ট ইন্টারফেস (UPI) পরিষেবা ১১ এপ্রিল ২০১৬-তে চালু করা হয়। নোটবন্দীর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে সরকারের এই উদ্যোগ। দেশে ডিজিটাল অর্থনীতিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয়েছে। নোট বাতিলের পর, ডিজিটাল মুদ্রা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অর্থনীতি তৈরির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছে। ২০১৬-১৭ সালে, ১০১৩ কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হয়। ২০১৭-১৮ সালে ২,০৭০.৩৯ কোটি টাকা এবং ২০১৮-১৯ সালে ৩,১৩৩.৫৮ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। ২০১৯-২০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ৫,৫৫৪ কোটি টাকা হয়েছে। ডিজিটাল লেনদেনের এই বৃদ্ধি করোনার সময়েও অব্যাহত ছিল এবং ২০২১-২২ সালে ডিজিটাল লেনদেন ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭,৪২২ কোটিতে পৌঁছেছে।

demonitisation

২) নোটবন্দীকরণ বা ডিমানিটাইজেশন : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ৮ নভেম্বর, ২০১৬-তে রাত ৮ টায় ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বন্ধ করার ঘোষণা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সারা বিশ্বে আলোচনা হয়। ৫০০ এবং ১০০০ টাকার পুরনো নোট ব্যাঙ্কে জমা করা হয়। সরকার ৫০০ ও ২০০০ টাকার নতুন নোট জারি করা হয়। নোটবন্দির ২১ মাস পরে, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুসারে, নোটবন্দির সময় রিজার্ভ ব্যাঙ্কে জমা করা ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটের মোট মূল্য ছিল ১৫.৩১ লক্ষ কোটি টাকা। নোট বাতিলের সময়, দেশে মোট ১৫.৪১ লক্ষ কোটি টাকার ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট প্রচলিত ছিল বাজারে। অর্থাৎ ৯৯.৩% টাকা রিজার্ভ ব্যাঙ্কে ফেরত আসে।

gst

৩) গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (GST) : কেন্দ্রীয় সরকার ১ জুলাই, ২০১৭-তে পণ্য ও পরিষেবা কর কার্যকর করে৷ অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকার ২০০০ সালে সারা দেশে একটি একক কর কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর পরে, ২০১১ সালের মার্চ মাসে, মনমোহন সিং সরকার লোকসভায় জিএসটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করে, কিন্তু রাজ্যগুলির বিরোধিতার কারণে এটি আটকে যায়। ২০১৪ সালে, নরেন্দ্র মোদি সরকার আবার অনেক পরিবর্তনের সঙ্গে সংবিধান সংশোধনী বিল নিয়ে আসে। বিলটি ২০১৬ সালের আগস্টে সংসদে পাস হয়। ১২ এপ্রিল ২০১৭-এ, সংসদে পাস হওয়ার পরে জিএসটি সম্পর্কিত চারটি বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেয়েছে। এই ৪ টি আইন হল – কেন্দ্রীয় জিএসটি বিল, ইন্টিগ্রেটেড জিএসটি বিল, জিএসটি (রাজ্যদের ক্ষতিপূরণ) বিল এবং কেন্দ্রশাসিত জিএসটি বিল। এরপর ২০১৭ সালের ১ জুলাই মধ্যরাত থেকে সারাদেশে নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হয়।

surgical attack

৪) সার্জিক্যাল স্ট্রাইক : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, জম্মু ও কাশ্মীরের উরি সেক্টরে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এই হামলায় ১৯ জন সেনা শহিদ হন। ২৮ শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে, উরি জঙ্গি হামলার ১০ দিন পরে, ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে প্রবেশ করে এবং সন্ত্রাসীদের আস্তানাগুলি ধ্বংস করে। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ পুলওয়ামা সন্ত্রাসী হামলায় ৪০ জন সিআরপিএফ কর্মী শহিদ হন। এই হামলার পরেও সীমান্ত পেরিয়ে, শত্রুকে শিক্ষা দেয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-এ পুলওয়ামা হামলার ১২ দিন পরে, ভারতীয় বিমান বাহিনীর মিরাজ এবং সুখোই বিমান পাকিস্তানে প্রবেশ করে একটি বিমান হামলা চালায়। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতের লড়াইয়ে বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

triple talaq

৫) তিন তালাক : তিন তালাককে কেন্দ্র করে ভারতে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এই বিতর্ক ১৯৮৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের একটি নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয়। ২০১৬ সালে তিন তালাক বিতর্কে আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর তিন তালাকের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেন সায়রা বানু নামে এক মহিলা। বিয়ের ১৫ বছর পর তিন তালাক বলে সম্পর্ক ভেঙে দেন সায়রার স্বামী। তারপর সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাকের বিরুদ্ধে রায় দেয় এবং সরকারকে এই বিষয়ে একটি আইন তৈরি করার নির্দেশ দেয়। ২৮ শে ডিসেম্বর ২০১৭-এ লোকসভায় মুসলিম মহিলা (বিবাহের অধিকার সুরক্ষা) বিল ২০১৭ পেশ করা হয়। ২০১৮ সালে, সরকার একটি নির্দেশের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করে। ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার নির্দেশ আনা হয়। একই বছর, সরকার আবার লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিল পেশ করে। এর পরে রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ নতুন আইন কার্যকর করার জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেন। মুসলিম মহিলাদের তিন তালাক থেকে মুক্তি দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থন পেয়েছে, আবার কিছু মানুষ এর বিরোধিতাও করেছে। তবে নতুন আইন অনুযায়ী, কোনো মুসলিম পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে তিনবার তালাক বলে সম্পর্ক শেষ করে, তাহলে তার তিন বছর পর্যন্ত কারাদন্ড হতে পারে। এর ফলে তিন তালাকের ঘটনা ৫%-১০%-এ নেমে এসেছে।

article 370

৬) ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার : তিন তালাকের মতো, ৩৭০ ধারার বিষয়টিও ভারতের স্বাধীনতার সঙ্গে শুরু হয়েছে। ১৯৪৮ সালে, জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে একীভূত হওয়ার আগে বিশেষাধিকারের শর্ত রেখেছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অংশ হয়েও আলাদা ছিল। সেই রাজ্য তার নিজস্ব সংবিধান তৈরি করেছে। সেখানে ভারতের কয়েকটিই আইন প্রযোজ্য ছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর, মোদি সরকার ৫ আগস্ট ২০১৯-এ ৩৭০ ধারা বাতিল করে। এর ফলে জম্মু ও কাশ্মীরেও কেন্দ্রের সমস্ত আইন প্রযোজ্য হয়। মনরেগা, শিক্ষার অধিকারও বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে এই আইন বাস্তবায়নের প্রাথমিক কিছু নেতিবাচক প্রভাবও দেখা গেছে। কিছু রাজনৈতিক দল এই আইন মানতে অস্বীকার করেছে।

 

caa

৭) সিএএ কার্যকর : প্রতিবেশী দেশগুলিতে নির্যাতিত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈন সংখ্যালঘুদের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে এলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। এই দেশগুলিতে নির্যাতিত সংখ্যালঘু শরণার্থীদের ভারতে নাগরিকত্ব পেতে ১১  বছর কাটাতে হয়। দেশে মৌলিক সুযোগ-সুবিধাও পায়না তারা। এটি সহজ করার জন্য, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে, এটি সম্পর্কিত বিল লোকসভা থেকে পাস করা হয়। রাজ্যসভায় পাস হওয়ার আগেই ১৬ তম লোকসভার মেয়াদ শেষ হয়। লোকসভা ভেঙে দেওয়ায় এই বিলটিও বাতিল হয়ে যায়। ১৭ তম লোকসভা গঠনের পরে, মোদি সরকার এই বিলটি নতুন করে পেশ করে। এই বিলটি ১০ ​​ডিসেম্বর ২০১৯-এ লোকসভা এবং ১১ ডিসেম্বর ২০১৯-এ রাজ্যসভায় পাস হয়। এটি ১০ ​​জানুয়ারী ২০২০-তে বাস্তবায়িত হয়।

ram mandir ayodhya

৮) রাম মন্দির নির্মান : ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকে দেশের সমালোচনার অন্যতম বিষয় ছিল রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ বিবাদ। অবশেষে ৯ নভেম্বর ২০১৯-এ অবসান হয় এই বিতর্কের। সুপ্রিম কোর্ট, অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতে রামলালার বিরাজমানের কথা বিশ্বাস করেন। অন্যদিকে, মুসলিম পক্ষকে অযোধ্যাতেই ৫ একর জমি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই রাম মন্দির নির্মাণের পরিকল্পনা করে কেন্দ্রীয় সরকার। রামায়ণ সার্কিট হল প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হল, যেখানে ভগবান রাম পরিদর্শন করেছিলেন এবং যেগুলি রামায়ণ সম্পর্কিত পৌরাণিক কাহিনীর কারণে বিখ্যাত, দেশের সেই সমস্ত স্থানকে সংযুক্ত করা। রামায়ণ সার্কিট হল ১৩ টি থিম ভিত্তিক পর্যটন সার্কিটের মধ্যে একটি যা পর্যটন মন্ত্রক স্বদেশ দর্শন প্রকল্পের অধীনে তৈরি করবে৷ এই সার্কিটের মাধ্যমে সারা বিশ্বের হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের মানুষকে রাম মন্দির দর্শনে আকৃষ্ট করতে এই পরিকল্পনা সরকারের। রামায়ণ সার্কিটের অধীনে থাকা সমস্ত শহরে উন্নত হোটেল, আবাসন সুবিধা সহ স্তরের অবকাঠামো স্থাপন করা হবে। অযোধ্যাও এর থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইউপি সরকারের পরিকল্পনা অযোধ্যাকে দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

lockdown modi 1

৯) করোনা মহামারির প্রতিরোধ : গোটা বিশ্ব যখন করোনার চাবুকে জর্জরিত সেই পরিস্থিতি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার। গোটা দেশ জুড়ে লকডাউন হয়ে যায়। সেই লাকডাউনে হয়ত অনেক অসুবিধায় পড়েছে মানুষ, কিন্তু তারপরও করোনা মহামারিকে অনেকাংশেই রুখে দিতে সক্ষম হয়েছে ভারত।

Avatar
Sudipto

সম্পর্কিত খবর