বাংলাহান্ট ডেস্ক: একটানা বৃষ্টি আর পাহাড়ি ধসের দাপটে ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে পশ্চিম সিকিমের (West Sikkim) গ্যালশিং জেলার রিম্বি (Rimbi) গ্রামের পরিস্থিতি। গত কয়েক মাস ধরে বারবার মাটি, পাথর ও কাদার স্রোত নেমে আসায় বিপর্যস্ত জনজীবন। আগস্ট থেকে এলাকায় ভূমিধসের (Landslide) প্রবণতা দেখা গেলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা ধ্বংসস্তূপ বসতিতে ঢুকে পড়ায় একের পর এক পরিবারকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিতে হয়েছে। প্রশাসনের তরফে রিম্বিতে ত্রাণশিবিরও চালু করা হয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক ধসের ঘটনায় বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
লাগাতার ভূমিধসে অস্তিত্ব সঙ্কটে পশ্চিম সিকিমের (West Sikkim) রিম্বির:
পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে রিম্বির ভবিষ্যৎ বসবাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সিকিমের (West Sikkim) রিলিফ কমিশনার রিনজিং চেওয়াং জানিয়েছেন, সিংলিটাম দিক থেকে বারবার ধস নামায় রিম্বির কিছু অংশকে আর নিরাপদ বা বসবাসযোগ্য বলে বিবেচনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, পরিস্থিতি আরও খতিয়ে দেখতে বর্ষার পর বহুবিষয়ক ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা করা হবে। ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলিকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩২টি বাড়ির আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপদ এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার কাজ হয়েছে। তার আগে ২৮টি বাড়ির ১২৮ জনকে সতর্কতামূলক ভাবে রিম্বি গ্রাম পঞ্চায়েত কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুন: রাজ্যের আবেদনে সায় দিল কেন্দ্র! পুজোর আগেই আরও বাড়ল ডিজিপি সিদ্ধনাথ গুপ্তের চাকরির মেয়াদ
ভূমিধসের পাশাপাশি রাস্তা ভেঙে পড়ায় গোটা এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত বিপর্যস্ত। রিম্বি থেকে মেলি-কেচুপরি-ইউকসমের দিকে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর সিক্সা খোলা থেকে প্রবল জলের স্রোতের সঙ্গে বিপুল ধ্বংসস্তূপ নেমে এসে গেইজিং-পেলিং-ইউকসম রুটের রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে প্রশাসন ও সড়ক দফতর নিয়মিত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়েছে। তবে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা থাকায় পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও নতুন ধসের ঘটনায় স্থানীয়দের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া এবং ত্রাণ দেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে।
রিম্বি-ইউকসম এলাকার ভূপ্রকৃতিও এই বিপদের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। সিকিমের সরকারি ল্যান্ডস্লাইড ইনভেন্টরিতে ইউকসম ও রিম্বির মধ্যবর্তী ‘মেলি স্লাইড’-কে সক্রিয় ভূমিধস এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে কোয়ার্টজাইট ও ফাইলাইটের সঙ্গে মাটির স্তর রয়েছে এবং অত্যন্ত ফাটলযুক্ত ও দুর্বল শিলাস্তরকে ঝুঁকির অন্যতম কারণ বলা হয়েছে। ওই পুরনো নথিতে মেলি স্লাইডের গড় গভীরতা প্রায় ২০ মিটার এবং নথিভুক্ত ব্যর্থ ভূমির আয়তন প্রায় ২.২৫ লক্ষ ঘনমিটার বলে উল্লেখ রয়েছে। গবেষণাতেও সিকিমের ভূমিধসের সঙ্গে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ের ঢালের কোণ, ভূতাত্ত্বিক গঠন, মাটি, জলনিকাশি, নদীর দূরত্ব ও ভূগর্ভস্থ জলের মতো একাধিক কারণের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।

আরও পড়ুন: বছরে ১.৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ, সঙ্গে সুদ! চাকরিহারা শিক্ষকদের মামলায় বড় নির্দেশ হাইকোর্টের
রিম্বির এই পরিস্থিতি যে হঠাৎ তৈরি হয়নি, তারও প্রমাণ রয়েছে। চলতি বছরের আগস্টেই রিম্বি সিংলিটাম এলাকায় সক্রিয় ভূমিধসের কারণে বহু পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে সেপ্টেম্বরের ভারী বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় এবং ২৫ সেপ্টেম্বরের ধস গ্রামের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সরকারি হিসাবে তখনও কোনও প্রাণহানির খবর ছিল না, কিন্তু অন্তত দু’টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভাবে ধুয়ে যায় এবং পরবর্তী মূল্যায়নে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে। ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩২টি বাড়ি ও চারটি সরকারি কোয়ার্টার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ফলে আপাতত রিম্বির মানুষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল নিরাপদে থাকা এবং নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা এড়ানো। মাটি কখন স্থির হবে, আর রিম্বির কোন অংশ ভবিষ্যতে বসবাসের জন্য নিরাপদ থাকবে—তার উত্তর মিলবে বিস্তারিত ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষার পরেই (West Sikkim)।













