বাংলা হান্ট ডেস্ক : দুর্গাপুজো মানেই একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) নেতা-মন্ত্রীদের । কোন পুজোর উদ্বোধন করবেন, কোথায় জনসংযোগে যাবেন, কোন মণ্ডপে কার সঙ্গে দেখা হবে—উৎসবের দিনগুলিতে সেই পরিকল্পনা ঘিরেই চলত রাজনৈতিক তৎপরতা। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রথম দুর্গোৎসবে সেই পরিচিত ছবি বদলেছে। দলের একাধিক প্রবীণ নেতা এবার থাকছেন প্রচারের আলোর বাইরে। কারও মনে পড়ছে পুরনো সহযোদ্ধাকে, কেউ অসুস্থতার কারণে ঘর ছাড়তে পারছেন না, আবার কেউ পুজোর মণ্ডপে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের টানাপড়েন এড়িয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দুর্গাপুজোয় কেমন করে কাটাচ্ছেন তৃণমূলের (Trinamool Congress) নেতা-কর্মীরা ?
দলের জন্মলগ্নের স্মৃতিতে ফিরে গেলে উঠে আসে চারটি নাম—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সি, মুকুল রায় ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কালীঘাটের একচালা ঘরে মা তারার পায়ে হাত রেখে তাঁরা একে অপরের পাশে থাকার শপথ নিয়েছিলেন বলে স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে। সেই সময় থেকে আজকের পরিস্থিতির মধ্যে অবশ্য অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। দলের বিস্তার হয়েছে, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছে তৃণমূল, আবার সময়ের সঙ্গে বদলেছে নেতৃত্বের সমীকরণও। বর্তমান সংকটের আবহে সেই পুরনো দিনের কথা মনে করেই আক্ষেপ করছেন একসময়ের প্রভাবশালী নেতা পার্থ চট্টোপাধ্যায়।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে পার্থ বলেন, “এই দল আর উঠে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে হয় না”। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেননি। পার্থর কথায়, “মমতা ভুল থেকে শিক্ষা নিল না। আগেও ভুল করেছে, যখনই যে ডুবেছে তার হাত ছেড়ে দিয়েছে। এখনও সেই শুধু নিজেরটুকু নিয়েই রয়েছে। এখনও যে ভুল করছে তার হাত ছেড়ে দিচ্ছে। এখনও ভুল করছে।” দলের পুরনো সহকর্মীদের মধ্যে মুকুল রায়ের অভাবও তাঁকে ভাবাচ্ছে। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য, “মুকুলকে খুব মিস করছি। ও থাকলে এবং সুস্থ থাকলে এই ক্রাইসিস হয়তো সামলে দিতে পারত। মমতার আশপাশে আগে যারা ছিল তারা যতটা পেরেছে ওকে ভুল বুঝিয়েছে, এখনও যারা রয়েছে তারাও ভুল বুঝিয়ে চলেছে।”
পুজোর মণ্ডপে রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়েও এ বার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, কলকাতা ও বিভিন্ন জেলায় একাধিক পুজোকে ঘিরে বিজেপির স্থানীয় নেতারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ বছর কোনও দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেননি। নিজের পাড়ার কালীঘাট মিলন সংঘের মণ্ডপে গিয়ে দুই শিশুকে দিয়ে ফিতে কাটিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্রেও এখনও পুজো উদ্বোধনের কোনও কর্মসূচি নেই বলে জানা গিয়েছে।
একসময় দুর্গাপুজোর সঙ্গে অরূপ বিশ্বাস ও ফিরহাদ হাকিমের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকত। কিন্তু এ বার সেই পরিচিত দৃশ্য অনেকটাই বদলে গিয়েছে। সুরুচি সংঘের পুজোর সঙ্গে অরূপ বিশ্বাসের নাম আর যুক্ত নেই। চেতলা অগ্রণীর পুজোয় ফিরহাদ হাকিম থাকলেও তাঁর উপস্থিতি আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে জানা যাচ্ছে। পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও বদল স্পষ্ট। নাকতলা উদয়ন সংঘের পুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু গ্রেপ্তারি এবং জেলজীবনের পর সেই পুজোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আর আগের জায়গায় নেই। এ বার নাকতলার বাড়িতেই পুজোর দিন কাটাবেন প্রাক্তন মন্ত্রী। তবে কোনও পুজো কমিটির সঙ্গে বর্তমানে তাঁর যোগ নেই, এমনকি পুজো উদ্বোধনের আমন্ত্রণও পাননি তিনি।
কলেজ স্কোয়ারের পুজো কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও এ বার সেখানে যাচ্ছেন না সৌগত রায়। তাঁর অভিযোগ, ওই পুজোয় বিজেপির নেতারা কর্তৃত্ব ফলাচ্ছেন। দমদমের কয়েকটি পুজো কমিটি থেকেও আমন্ত্রণ এলেও সেখানে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। বরং দিল্লির করোলবাগে একটি পুজো কমিটির আমন্ত্রণে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন বর্ষীয়ান সাংসদ। এদিকে, শারীরিক অসুস্থতার কারণে সুব্রত বক্সিও এ বার খুব বেশি বাইরে বেরোতে পারছেন না। কয়েক মাস আগে অস্ত্রোপচারের পর থেকে বাড়িতেই বেশি সময় কাটাচ্ছেন তৃণমূলের প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি। তাঁর ভাই সন্দীপ বক্সি জানিয়েছেন, মাঝেমধ্যে কাছের বকুলবাগান রোডের পার্টি অফিস কিংবা পাড়ার ‘ঐকতান’ পুজোয় গিয়ে বসছেন সুব্রত।

আরও পড়ুন : ‘অযোগ্যকে ওই পদে নিয়োগ আইনসম্মত নয়’, অধ্যক্ষ নিয়োগ নিয়ে কড়া বার্তা হাই কোর্টের
তবে সবার পুজোর রুটিন এক নয়। তৃণমূলের প্রথম জয়ী বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় নিজের হাজরা পার্কের পুজোর পাশাপাশি আরও কয়েকটি মণ্ডপের উদ্বোধন করেছেন। বালিগঞ্জ ও তাঁর পুরনো কেন্দ্র রাসবিহারীর বিভিন্ন পুজোতেও গিয়েছেন। প্রতি বছরের মতো এ বারও অষ্টমীর সন্ধ্যায় হাজরা পার্কে আরতি করবেন তিনি। শোভনদেবের কথায়, “এবারের পুজো কিছুটা হালকা। তবে বেশ কিছু পুজোয় আমন্ত্রণ ছিল, সেসব মিটিয়ে নিয়েছি। পারলে পুজোয় এ পাড়া-সে পাড়ায় কিছুটা ঘুরব নিজের মতো।” তৃণমূল নেতাকর্মীদের দুর্গাপুজো যেন অন্য গল্প বলছে। কারও উৎসব কাটছে স্মৃতিচারণে, কারও দূরে সরে থেকে, কারও আবার সীমিত কর্মসূচিতে।














