বাংলা হান্ট ডেস্ক: যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতকে সামরিক দিক থেকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্যে একের পর এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি তথা ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিওরিটি তথা CCS ভারতীয় নৌবাহিনীর (Indian Navy) জন্য ৮ টি নেক্সট জেনারেশন তিথা পরবর্তী প্রজন্মের করভেট তৈরির একটি বিশাল প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০,০০০ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন পাওয়া এটিই প্রথম বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্প। এই সিদ্ধান্তটিকে নৌবাহিনীর (India) সারফেস ফ্লিট শক্তিশালীকরণ এবং দেশে জাহাজ নির্মাণ ক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির দায়িত্ব দেশের দু’টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা জাহাজ নির্মাণকারী সংস্থা কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (GRSE) এবং গোয়া শিপইয়ার্ড লিমিটেড (GSL) দেওয়া হয়েছে। এই দু’টি সংস্থা যৌথভাবে এই ৮ টি অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ (Warship) নির্মাণ করবে। এর ফলে উভয় সংস্থায় দীর্ঘমেয়াদী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর (Indian Navy) জন্য ৮ টি নেক্সট-জেন-স্টিলথ যুদ্ধজাহাজ তৈরির অনুমোদন:
এই নেক্সট জেনারেশন করভেটগুলি কী হবে: জানিয়ে রাখি যে, এই করভেটগুলিকে তাদের শ্রেণির সবচেয়ে অ্যাডভান্স যুদ্ধজাহাজগুলির মধ্যে গণ্য করা হবে। শত্রুর নজর এড়ানোর এক অনন্য ক্ষমতা এদের থাকবে। এই জাহাজগুলি অত্যন্ত উচ্চ গতিতে মোড় নিতে এবং কৌশল পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে। এগুলি আধুনিক অস্ত্র ও সেন্সর দিয়েও সজ্জিত থাকবে। এছাড়াও, এগুলি হবে মাল্টি-রোল প্ল্যাটফর্ম। এর অর্থ হল, একটিমাত্র জাহাজই জলের উপরিভাগে শত্রু জাহাজের মোকাবিলা করতে, জলের নিচে সাবমেরিনকে প্রতিহত করতে এবং আকাশ থেকে আসা হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। এটি উপকূলীয় নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সামুদ্রিক টহল এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানেও ব্যবহার করা যাবে। এই যুদ্ধজাহাজগুলিতে ৭০ শতাংশেরও বেশি দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করা হবে। এটি আত্মনির্ভর ভারত অভিযানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বিদেশি নির্ভরতা হ্রাস এবং দেশীয় শিল্পের প্রসারের দিকে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। যখন অধিকাংশ জাহাজ দেশেই তৈরি হবে, তখন প্রযুক্তি ও দক্ষতাও দেশেই থেকে যাবে। এদিকে, এই অনুমোদনটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ভারতীয় নৌবাহিনী ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। এই অঞ্চলে চিনা নৌবাহিনীর কার্যকলাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় আধুনিক ও বহুমুখী যুদ্ধজাহাজের প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে। নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই নীলগিরি ক্লাসের ফ্রিগেট, পরবর্তী প্রজন্মের ডেস্ট্রয়ার এবং ফ্লিট সাপোর্ট শিপ তৈরির কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এমতা বস্থায়, এই ৮ টি করভেট যুক্ত হওয়ায় সমগ্র যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ কর্মসূচি আরও শক্তিশালী হবে। এদিকে, এক বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে এবং প্রথম করভেটগুলি ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে সরবরাহ করা হবে। এর ফলে নৌবাহিনীর বহরে নতুন জাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হবে। পুরনো জাহাজগুলিকে আধুনিক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে পরিচালনগত দক্ষতা বাড়বে।

আত্মনির্ভরশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব: উল্লেখ্য যে, এই প্রকল্পটি শুধু সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং, এটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করবে। এদিকে, গার্ডেনরিচ এবং গোয়া শিপইয়ার্ড একটি দীর্ঘমেয়াদী কাজের সুযোগ পাবে। যা তাদের আর্থিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। এর ফলে নিকটবর্তী ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিও কর্মসংস্থান পাবে। যন্ত্রাংশ, সরঞ্জাম ও পরিষেবার সরবরাহ শৃঙ্খলে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।
আরও পড়ুন: টিউটোপিয়া স্কুল অ্যান্ড কেরিয়ার গাইড; পড়াশোনা থেকে সফল কেরিয়ার, ছাত্রছাত্রীদের পাশে Tutopia
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, দেশীয় উপকরণের ব্যবহার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরণের জাহাজ রফতানির সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। যখন দেশ নিজেই উন্নত যুদ্ধজাহাজ তৈরি করবে, তখন অন্যান্য দেশের কাছে সেগুলি বিক্রি করার পথ খুলে যেতে পারে। CCS-এর এই অনুমোদন প্রধান প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলির ওপর সরকারের অগ্রাধিকারমূলক মনোযোগকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। নৌবাহিনীর চাহিদা মেটাতে আধুনিক প্ল্যাটফর্মও তৈরি করা হচ্ছে। স্টিলথ প্রযুক্তি, মাল্টি রোল ক্ষমতা এবং উচ্চমাত্রার দেশীয়করণই এই করভেটগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হবে।
এদিকে, নির্মাণকাজ শুরু হলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সময়মতো হস্তান্তর অপরিহার্য হবে। নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হলে এই প্রকল্পটি ভারতীয় নৌবাহিনীর সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের উপস্থিতি আরও জোরদার হবে এবং তা আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে। এছাড়াও, এই সিদ্ধান্ত সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানকে উৎসাহিত করবে। এটি আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যের দিকে একটি বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।












