টাইমলাইনপশ্চিমবঙ্গবিনোদনবিশেষগ্যালারিছবি

সামনেই গরমের ছুটি, রইল উত্তরবঙ্গের চারটি ‘ট্রু-অফবিট ডেস্টিনেশনের’ সুলুকসন্ধান

১.তামাং গাঁও

সন্ধ্যেবেলা চায়ের কাপটা হাতে অনেক্ষন ধরে বসে ঝিঁঝির ডাক শুনতে শুনতে হঠাৎ করেই কেমন যেন মনে হয়, আচ্ছা এমন নৈসর্গিক কি অদৌও কিছু হয়? নাকি সবটাই মায়া…নিছক রূপকথা?
…আসলে আমাদের শহুরে কোলাহলে আর ক্যাকোফোনিতে অভ্যস্ত কানগুলো ভুলতেই বসেছে পাহাড়ি ঝোরার শব্দ, পাখির ডাক, ঘুম ভাঙলেই চেনা পরিচিত শব্দের বাইরে একটা সকাল।
কোনো দেবীর শ্বেত শুভ্র রজনীগন্ধার মালা থেকে ঝরে পড়া রজনীগন্ধার মতন এমন এক সকাল আপনি উপহার পারেন তামাং গাঁওতে

সিঙ্গলীলার ঘন জঙ্গলে মোড়া পাহাড়ের কোলে ৭০০০ ফুট উচ্চতায় সকালের এক কণা শিশিরের মতন স্নিগ্ধ গ্রাম – তামাং গাঁও। মূলত তামাং জনগোষ্ঠীর বাস এই ছোট্ট গ্রামে। তামাংদের চাষবাসের কারণেই সারাবছরই সবুজের চাদরে মটরশুঁটির ফুলের কলকায় সেজে থাকে তামাং গাঁও। চোখ মেললেই চারিদিকে সবুজ ক্ষেত,পাহাড়, আর মাথার উপর নীল আকাশ।
ট্যুরিজম এখনও পুরোপুরি থাবা বসাইনি এখানে। হোম স্টে শব্দটার এখনও এখানে সেই অর্থে বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে যায়নি। তাই সত্যি করে অফবিট বলতে যা বোঝায় তার স্বাদ বোধহয় হাতে গোনা আরও কয়েকটি জায়গার মতন তামাং গাঁওতেই পাওয়া সম্ভব। সঙ্গে বাড়তি পাওনা স্থানীয়দের উষ্ণ অভ্যর্থনা।

‌যাঁরা প্রকৃতির মাঝে নিশ্ছিদ্র শান্তি চান তাঁদের জন্যই এই গ্রাম। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা সকাল আর ঝোরার শব্দ ছাড়া খুব কম আওয়াজই পাওয়া যাবে এখানে।
‌এছাড়াও যাঁরা ট্রেকিং এবং অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন কিন্তু খুব বড় ট্রেকে যাওয়ার মতন শারীরিক ক্ষমতা নেই তাঁদের জন্যও স্বর্গরাজ্য এই ছোট্ট পাহাড়ি হ্যামলেট।
তামাং গাঁও থেকেই করা যায় ছোট্ট নামলা জঙ্গল ট্রেক। রাউন্ড ট্রেকে সময় লাগে মাত্র ঘন্টা আড়াই তিন।
এখান থেকে একদিনে ট্রেক করে পৌঁছে যাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সান্দাকফুতে। সময় লাগে ঘন্টা পাঁচেক।
সারাদিনের অ্যাডভেঞ্চার চাইলে যাওয়া যেতেই পারে ব্ল্যাক ফরেস্ট ট্রেকে। পাইনের জঙ্গলের সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে শিহরণ জাগতে বাধ্য।
‌এছাড়াও নবিশ দের জন্য আছে তিনতালে জঙ্গল ট্রেক।
‌ট্রেক করতে পারেন শতাব্দী প্রাচীন মানেদাড়া মনেস্ট্রি, গুমফা, জরায়ো পোখারী লেকও।

‌ট্রেক করতে না চাইলে গাড়ি করে ঘুরে আসতে পারেন ধোত্রে, চিত্রে, লামাধুরা,মেঘমা, টংলু, মুংমুংখোলা, শ্রী খোলা, হ্যাংগিং ব্রিজ, রিমবিক মোনাস্টারি, গুম্ববা দাঁড়া ভিউ পয়েন্টও।

ট্রেন পথে খুব সহজে পৌঁছে যেতে পারেন তামাং গাঁও তে। শিলিগুড়ির দার্জিলিং মোড় থেকে শেয়ার গাড়ি পাওয়া যাবে। আবার রিজার্ভ করেও নেওয়া যেতে পারে গাড়ি। নিউ জলপাইগুড়ি থেকেও পেয়ে যাবেন রিজার্ভ গাড়ি। সময় লাগে শিলিগুড়ি থেকে ৪-৪.৫ ঘন্টা । আবার দার্জিলিং থেকে পাওয়া যাবে রিজার্ভ ও শেয়ার গাড়ি।
শেয়ার গাড়ির সম্ভাব্য সময় দার্জিলিং মোড় থেকে – সকাল ৬টা, বেলা ১১টা, দুপুর ২টো। ভাড়া ৬০০টাকা মাথাপিছু।
দার্জিলিং থেকে সময় – সকাল ৭টা, বেলা ১২টা, দুপুর ২ টো। ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা।
এছাড়াও এনজেপি থেকে গাড়ি বুক করলে খরচ হবে ৬৫০০-৭০০০ টাকা মতন।

তামাং গাঁওতে থাকুন ফ্রি সোল’স স্টে – তামাং গাঁও তে। প্রতীক এবং তানিয়ার আতিথেয়তা মন কাড়তে বাধ্য। আদ্যপান্ত শহুরে জীবন ছেড়ে পাহাড়ের টানে তামাং গাঁওই এখন ওদেরও ঠিকানা।

 

২.খড়কা গাঁও
শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে দুদন্ড পালিয়ে যেতে চান এমন কোথাও যেখানে কাজের চাপ নয় বরং আপনাকে স্বাগত জানাবে সুন্দরী কাঞ্চনজঙ্ঘা আর অবারিত প্রকৃতি? যেখানে অর্কিডের রূপে ভুলে যাওয়া যায় অফিসের ডেডলাইন কিংবা টার্গেট? তাহলে খড়কা গাঁও অপেক্ষা করেই আছে আপনার জন্য। কালিম্পং থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরের অসম্ভব সুন্দর পাহাড়ি গ্রাম খড়কা গাঁও। ছোট্ট এই পাহাড়ি হ্যামলেট হ্যামলেটের ট্র‍্যাজেডি নয়, একরাশ মুগ্ধতা নিয়েই অপেক্ষা করবে আপনার জন্য। চারিদিকে সবুজের মাঝখানে ছোট্ট এই গ্রামটি। সব মিলিয়ে মোটামুটি গোটা চল্লিশ পরিবারের বাস। বেশিরভাগেরই পদবী রাই। প্রায় সবাইই সবার আত্মীয়। তাই এরকম একটা গ্রামে গেলে যে একটা নিপুন আত্মীয়তার স্বাদ পাওয়া যাবেই সেটা বলার খুব একটা দরকার লাগে না বোধহয়।

 

যেহেতু কালিম্পং টাউন থেকে অত্যন্ত কাছে এই গ্রামটি তাই এখান থেকে সাইটসিয়িং করতে চাইলে ঘুরে দেখা সম্ভব কালিম্পং এর সবকটি সাইটসিয়িং পয়েন্টই। একই সঙ্গে ঘুরে নেওয়া যায় লাভা, লোলেগাঁও, কাফের গাঁওও। সাইট সিয়িং করতে না চাইলেও সমস্যা নেই কিছু। সারাদিনটা হুশ করে কেটে যাবে পাখি দেখে কিংবা গ্রামের এদিক ওদিক ছোটো ছোটো হাইকিং করে। কাঞ্চনজঙ্ঘা এখানে আক্ষরিক অর্থেই আটপৌরে…দিনশেষের আরামটুকুর মতন! তাই তার কথা আর নতুন করে নাই বা লিখলাম!

এনজেপি থেকে খড়গা গাঁও এর দূরত্ব ওই ৭৫ কিলোমিটার মতন। গাড়িতে সময় লাগবে সাড়ে তিন ঘন্টা মতন। দার্জিলিং থেকেও আসা যায় এখানে। দূরত্ব ৫৮ কিলোমিটার। সময় লাগে ৩ ঘন্টা।
তবে গাড়ির খরচ বাঁচাতে চাইলে বাসে বা শেয়ার গাড়িতে কালিম্পং এসে সেখান থেকেও চলে আসা যাবে খড়কা গাঁও। সময় লাগবে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিনিট।

খড়গা গাঁওতে থাকতে পারেন যোগেশ দাজুর বাড়িতেই। অর্কিড হোমস্টেতে।

 

৩.ঝেপি

দার্জিলিং থেকেই বলতে গেলে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ২০৭৭ মিটার উচ্চতায় ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম ঝেপি। যেমন মিষ্টি নাম, তেমনই মাতাল করা রূপ। গ্রামের মধ্যে দিয়েই বয়ে গেছে ঝেপিখোলা। চারিদিকে সবুজের অভিযান দেখে সত্যিই যেন ফিরতে ইচ্ছে করে না আর। এদিক ওদিকের অগনিত হাইকিং ট্রেলের কোনও একটাতে খানিক ক্ষণ নিরুদ্দেশ হয়ে সত্যিই যেন খুঁজে পাওয়া যায় নিজেকে। আপনি যদি ইতিমধ্যেই উদ্দাম প্রকৃতির প্রেমে পড়ে থাকেন তাহলে ঝেপি আপনার অভিসার যাত্রা। একদিকে যেন সবুজ রেশম শাড়ি পরিহিতা প্রিয়তমার মাদকতা, অন্যদিকে বুকের কোনে জমে থাকা যন্ত্রনা গুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া দুর্দম ঝেপি খোলা…
এই অভিসারের পর বিরহ কি সত্যিই মেনে নেওয়া সম্ভব?

দুদিন কাটানোর জন্য ঝেপি স্বয়ংসম্পূর্ণা। কিন্তু তবুও চাইলেই আশেপাশের এলাকা গুলিও ঘুরে দেখতেই পারেন। এখান থেকে সামালবং, রেলিং, বিজনবাড়ি তিনটিরই দূরত্ব ৬ কিলোমিটারের মধ্যে। গাড়ি নিয়ে ঘুরে দেখতে পারেন জোড় পোখরি, লেপচাজগৎ, সীমানা বাজার এবং সংলগ্ন এলাকা গুলিও।

একই সঙ্গে অসংখ্য জঙ্গলের ট্রেল রয়েছে গ্রামের আশেপাশে। একবেলার হাইকিং ও করতে পারেন সেগুলিতে। তবে আপনি যদি কিচ্ছু না করতে চান, যদি খোলার জলে চা চুবিয়ে প্রিয়জনের হাতে হাত রাখতে চান, কিংবা যদি শুধুই প্রেমে পড়তে চান সুন্দরী হিমালয়ের…. তাহলেও এর চেয়ে ভালো ডেস্টিনেসন সত্যিই খুব কম হতে পারে অফবিট উত্তরবঙ্গে।
শিলিগুড়ি থেকে ঝেপির দূরত্ব ১১০ কিমি। দার্জিলিং থেকে ঝেপির দূরত্ব ৩৫ কিমি।
এনজেপি থেকে সরাসরি গাড়ি নিয়েই আসা সম্ভব। তবে চাইলে দার্জিলিং অবধি শেয়ার গাড়িতে এসে সেখান থাকেও গাড়ি নেওয়া যায় খরচ খানিক বাঁচাতে।

ঝেপিতে থাকার সবচেয়ে ভালো ঠিকানা রবিজির চেতনা ফার্ম স্টে। হোমস্টের উঠোন দিয়ে বয়ে চলা নদী কুলুকুলু, অসাধারণ খাবার আর আন্তরিকতার উষ্ণতায় ফিরে আসায় মুশকিল হয়ে যায় ঝেপি থেকে।

 

৪.তেন্দ্রাবং
কালিম্পং শহর থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে নেওড়া ভ্যালির কোলে অচেনা এক পাহাড়ি হ্যামলেট তেন্দ্রাবং। ছোট্ট এই লেপচা গ্রামে সকাল সকাল জানলার পর্দার আড়াল আবডাল থেকে উঁকি দিয়ে ‘গুড মর্ণিং’ বলে যায় গলন্ত সোনা মাখা কাঞ্চনজঙ্ঘা। ছোট্ট এই পাহাড়ি গ্রামে সকাল আসে হাজার হাজার পাখির ডাকে পাইনের ঠেসাঠেসি ভীড় পেরিয়ে।
সপ্তাহান্তে দুটো দিন নেহাত ছুটিই হোক বা ‘ওয়ার্ক ফ্রম মাউন্টেন’ এর ফাঁকে একটু অ্যাডভেঞ্চার সব কিছুতেই পারফেক্ট তন্দ্রাবং। সারাদিন বসে মুগ্ধ চোখে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা, কাছে পিঠে হাইকিং, বার্ড ওয়াচিং থেকে শুরু করে শুধুই গাড়ি করে সাইট সিয়িং সবটাই করা সম্ভব এখানে। এসবের সঙ্গে উপরি পাওনা গ্রামের মানুষদের সঙ্গে তাঁদের ক্ষেতে বা বাগানে কাজ করা এবং ওই কটা দিন ওই গ্রামেরই একজন হয়ে ওঠার সুযোগ।


তেন্দ্রাবং থেকে ঘুরে আসা সম্ভব লাভা,রিশপ,কোলাখাম,ছাঙ্গে ফলস এবং নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্কে।

এনজেপি থেকে সরাসরি গাড়িতে এলে খরচ ৩৫০০-৪৫০০ টাকা। কিন্তু কালিম্পং অবধি এসে সেখান থেকে গাড়ি নিলে খরচ পড়বে মোটামুটি ১৫০০-২৫০০ টাকা মতন। হোমস্টেতে বললেই গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যাবে। কালিম্পং থেকে তেন্দ্রাবং পৌঁছাতে সময় লাগে ঘন্টাখানেক।

এখানে থাকতে পারেন জাস্টিন দাজুর বাড়িতে। অর্কিড হোমস্টে তেন্দ্রাবং।

Related Articles