সবকিছুর মূলে জ্যোতিপ্ৰিয়! এবার শাহজাহান, বাবু মাস্টারদের নিয়ে দলেরই আদি নেতাদের নিশানায় বালু

বাংলা হান্ট ডেস্কঃ বিগত প্রায় দুমাস ধরে সংবাদ শিরোনামে সন্দেশখালি (Sandeshkhali)। নিত্যদিন সেখান থেকে নতুন করে অশান্তির ঘটনা উঠে আসছে। এদিকে লোকসভার ভোটের আগে ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে রোজই সন্দেশখালি পৌঁছে যাচ্ছেন শাসকদলের কোনো না কোনো প্রতিনিধি। পিছিয়ে নেই বিরোধীরাও। বহু বাধা-বিপত্তিকে অতিক্রম করে তারাও পৌঁছে যাচ্ছেন সন্দেশখালির সাধারণ মানুষের কাছে। শাসক-বিরোধী উভয়ই সন্দেশখালিবাসীর অভিযোগ শুনছে। সংবাদমাধ্যমের সামনেও নিজেদের অভিযোগ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন সাধারণ মানুষেরা। সকলেরই নিশানায় শাহজাহান (Shahjahan Sheikh), বাবু মাস্টাররা। তবে স্থানীয় আদি তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ এই গোটা পরিস্থিতির দায় চাপাচ্ছেন জেলবন্দি তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক (Jyotipriya Mallick) ওরফে বালুর ওপর। কিন্তু এখানে বালুর কী ভূমিকা?

   

দলের স্থানীয় আদি নেতাদের একাংশের দাবি, জ্যোতিপ্ৰিয়র প্রশ্রয়েই বসিরহাট সহ এলাকা জুড়ে দাপিয়ে বেড়াত শাহজাহানেরা। তার আসকারাতেই যত বারবাড়ন্ত। তবে দলের প্রবীণদের দাবি মানতে নারাজ দলের অন্য অংশ। নেতার বিরুদ্ধে কটু কথা শুনতে নারাজ তারা। তাদের কথায় দল তো জ্যোতিপ্ৰিয়র একার কথায় চলত না! শাহজাহান-বাবুদের তিনি একা প্রশ্রয় দেবেনই বা কী করে! শুধুমাত্র জেলে রয়েছেন বলেই জ্যোতিপ্ৰিয়র ওপরে সব দায় চাপানো হচ্ছে বলেও মত তাদের।

বর্তমানে পাত্তা নেই শেখ শাহজাহানের। ওদিকে রেশন দুর্নীতির অভিযোগে জেলবন্দি তৃণমূলের জ্যোতিপ্ৰিয়। বালু আর সন্দেশখালির বেতাজ বাদশা শেখ শাহজাহানের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল তা বোঝার বাকির নেই কারও। শেখ শাহজাহানের নামে নামকরণ করা ‘শেখ শাহজাহান ফ্যান ক্লাব’ উদ্বোধনেও উপস্থিত ছিলেন জ্যোতিপ্ৰিয়। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল গঠনের সময় থেকেই উত্তর ২৪ পরগনা জেলার রাজনীতির দায়িত্ব বালুর ওপর দেন মমতা। নেত্রীর নির্দেশে একসময় এই বালুই ছিলেন উত্তর ২৪ পরগনা জেলার রাজনীতিতে ‘শেষ কথা’। প্রথমে ১০ বছর গাইঘাটা এবং পরে তিন বার হাবড়া থেকে বিধায়ক হন বালু। উত্তর ২৪ পরগনার জেলার এমন কোনও কোণা ছিল ণা যা বালুর অচেনা ছিল। জেলা সংগঠনের পর্যবেক্ষকের পাশাপাশি জেলা সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন জ্যোতিপ্ৰিয়।

২০১১ সালে বামকে হারিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর রাজ্য মন্ত্রিসভায় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পায় জ্যোতিপ্রিয়। এরপরই বনগাঁ-বসিরহাটের মতো সীমান্তবর্তী এলাকায় সিপিএম সদস্যদের তৃণমূলের যোগদান হয় বালুর হাত ধরেই। আর এই শাহজাহানের উত্থান বাম জামানার শেষ দিকে। কাঠ, গরু পাচার সহ মানুষ পাচারেরও অভিযোগে অভিযুক্ত শাহজাহান। বাম জামানায় বিধায়ক অনন্ত রায়ের আস্থাভাজন ছিলেন তিনি। এরপর ২০১১ সালে নয়া সরকার ক্ষমতায় আসতেই মাথার ওপর পাহাড় ভেঙে পড়ে শাহজাহানের।

পরে ২০১৪ সালে তৃণমূলে যোগদান করেন শাহজাহান, বাবু মাস্টাররা।জানা যায় জ্যোতিপ্ৰিয় মল্লিকের হাত ধরেই জোড়াফুলে ফোটেন শাহজাহান। পদও পেয়ে যান খুব দ্রুতই। বর্তমানে জেলা পরিষদের মৎস্য ও প্রাণী কর্মাধ্যক্ষ পদে রয়েছেন তিনি। কান পাতলেই শোনা যায় তার ডাকে সন্দেশখালি এলাকায় বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়।

শোনা যায়, তৃণমূলের আদি নেতারা সেই সময় অনেকেই দলে এই শাহজাহানদের যোগদানের বিরোধিতা করেন। তবে কারও কথাই শোনেন নি জ্যোতিপ্রিয়। এরপর আর কী! ট্রেকারের হেলপার থেকে রাতারাতি শাহজাহান কয়েকশো কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন শাহজাহান। পুলিশ চলত তার আঙুলের ইশারায়। পুলিশের কাছে কোনও অভিযোগ নিয়ে গেলেই বলা হট, বিচার দিতে পারেন একমাত্র শাহজাহান।

শুধু শাহজাহান নয়। সেই দলে রয়েছেন বাবু মাস্টারও। একই ভাবে হাসনাবাদে বাবু মাস্টারকেও তৃণমূলে ফিরিয়েছিলেন বালু। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বিজেপিতে যান বাবু। তারপর ভোটে বিজেপি হারলে আবার বালুর হাত ধরেই দলে ফিরে আসেন। স্থানীয় তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের একাংশের কথায়, কারও কোনো বারণ শুনতেন না জ্যোতিপ্ৰিয়। দলের নেতাদের অনেকের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও শাহজাহানদের মতো এদের সকলেই তৃণমূলে এনে ক্ষমতা দিয়েছিলেন জ্যোতিপ্ৰিয়ই।

jyotipriya mallick

আরও পড়ুন: ‘শাঁখা-চুড়ি পরে বসে থাকুন, দায়িত্বটা আমাদের দিন’, পুলিশকে ঝাঁঝালো আক্রমণ সন্দেশখালির মহিলার

শাহজাহান, বাবু মাস্টারদের মতো নেতাদের দলে আনাই জ্যোতিপ্ৰিয়র সবথেকে বড় ভুল ছিল বলে মনে করছেন অনেকেই। ২০১৯ সালের জুন মাসে বসিরহাটে একই দিনে তিন জন বিজেপি কর্মী খুনের ঘটনায় সন্দেশখালি থানার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন শেখ শাহজাহান। তবে থানায় নিয়েও ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল শাহজাহানকে। এর পেছনেও জ্যোতিপ্ৰিয়র হাত ছিল বলে জানা যায়। দলের প্রবীণ ‘প্রতিবাদী’ নেতাদের কথায়, ‘এলাকায় নিজের দাপট অব্যাহত রাখতে শাহজাহান-বাবুরাই ছিলেন জ্যোতিপ্ৰিয়র একমাত্র ভরসা। তারা বলেন, ‘বালুদা এখন জেলে বসে আছেন, তবে যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গিয়েছে।’ আজ সন্দেশখালিকাণ্ডে দলের দিকে যেই আঙ্গুল উঠছে তার দায়ও জ্যোতিপ্ৰিয়র বলেই মনে করছেন সেই সব নেতাদের একাংশ।

Sharmi Dhar
Sharmi Dhar

শর্মি ধর, বাংলা হান্ট এর রাজনৈতিক কনটেন্ট রাইটার। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। বিগত ৩ বছর ধরে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ।

সম্পর্কিত খবর