১৩০০ চীনা জওয়ানকে করেছিলেন নিকেশ! শহিদ মেজর শয়তান সিংকে পরমবীর চক্র দিল ভারত সরকার

বাংলা হান্ট ডেস্ক : বর্তমানে চিনা সেনার সাথে সমানে সমানে টক্কর নেয় ভারতীয় সেনা (Indian Soldier)। ডোক লাম এবং প্যাঙ্গং লেকে দুই দলের মুখোমুখি সংঘাতে বড় শিক্ষা পেয়েছে কম্যুনিস্ট লাল চিনের (China) সেনারা। ভারত মায়ের সন্তানেরা পিষে দিয়েছে চিনা আধিপত্যকে। আর এই শৌর্য্য শুধু আজকের নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এমন বীরত্ব দেখিয়ে এসেছে ভারতীয় সেনা। আজ আমরা 1962 সালে রেজাং লা (Rezang La) এর যুদ্ধের বিষয়ে জানাবো আপনাদের।

চিনা সেনাকে নিজেদেরক শৌর্য্য বীর্যের পরিচয় দেয় ভারত মায়ের বীরপুঙ্গবরা

   

চিন এবং ভারতীয় সেনার যুদ্ধের (India China War) এক অখ্যাত কাহিনী এটি। ঘটনার শুরু 1962 সাল। কিছু সময় আগেই চিনের ক্ষমতা দখল করেছে মাও সে তুং এর লাল পার্টি। হঠাতই তারা আক্রমণ করে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতকে (India)। এই যুদ্ধে, কম সম্পদ থাকা সত্ত্বেও, ভারত মুখোমুখি হয় চীনের। বহু জায়গায় চিনা সেনাকে নিজেদেরক শৌর্য্য বীর্যের পরিচয় দেয় ভারত মায়ের বীরপুঙ্গবরা।

দেশনায়ক শয়তান সিং-র গল্প

18 নভেম্বর 2020 তে 1962 সালে সংঘটিত ভারত-চীন যুদ্ধের 58 বছর পূর্ণ হয়। আর এই যুদ্ধের এক অখ্যাত সংগ্রাম রেজাং লার যুদ্ধ (Rezang La War)। সেখানে 124 জন ভারতীয় সৈনিক 1300 লাল ফৌজকে হত্যা করে। আজকের যুদ্ধের নায়ক মেজর শয়তান সিং (Shaitan Singh)। মাত্র 37 বছর বয়সে দেশের জন্য শহীদ হন। অখ্যাত এই দেশনায়কের জন্মদিন আজ। 37 বছর বয়সী শয়তান সিংয়ের নেতৃত্বে 13 তম কুমাওন ব্যাটালিয়নের সি কোম্পানি, 16000 ফুট উচ্চতায় অবস্থিত রেজাং লা পাসে চীনা সৈন্যদের মুখোমুখি হয়। রেজাং লা পাসের যুদ্ধ পরিচিত মেজর শয়তান সিংয়ের সাহসিকতার জন্য।

1x 1 2 1

সাড়ে তিনটার সময় আক্রমণ হানে চিনের লালফৌজ

মেজর শয়তান সিং তার 123 জন সৈন্যের সাথে নিজের পোস্ট পাহারা দিচ্ছিলেন। তখনই তাদের ওপর 3000 এরও বেশি চীনা সৈন্য আক্রমণ করে। সেসময় প্রতিটি ভারতীয় সৈন্যের কাছে ছিল মাত্র 400 রাউন্ড বুলেট এবং খুব কম হ্যান্ড গ্রেনেড। কিন্তু তাদের ছিল সাহস, বীরত্ব। 18 নভেম্বর গভীর রাতে হামলা চালায় চিন। অচকিত অবস্থায় ভোর সাড়ে তিনটার সময় আক্রমণ হানে চিনের লালফৌজ। মেজর শেতান সিং সাহায্যের আবেদন পাঠান নিজের অফিসারদের কাছে। কিন্তু সেখান থেকে সাহায্য দেওয়ার পরিবর্তে তাদের পোস্ট ছেড়ে পিছু হঠতে নির্দেশ আসে।

নিশ্চিৎ মৃত্যু জেনেও কোনো সেনা পোস্ট ছাড়তে রাজি থাকেনি

কিন্তু ভারত মায়ের বীর সন্তান মেজর শেতান সিং সিদ্ধান্ত নেন তিনি পিছু হটবেন না। তবে নিজের সৈন্যদের নির্দেশ দেন তারা কেও পিছু হঠে নিজের জীবন বাঁচাতে চাইলে বাধা দেওয়া হবেনা। নিশ্চিৎ মৃত্যু জেনেও কোনো সেনা পোস্ট ছাড়তে রাজি থাকেনি। এদিকে চিনা সেনারা ভারতীয় সেনার কাছে যে বেশি অস্ত্র নেই সেই বিষয়ে আগের থেকেই অবগত ছিল। চিনের সেনারা ধরেই নেয় যে, ভারতীয় সেনাবাহিনী পোস্টটি পরিত্যাগ করেছে। কিন্তু তাদের ভুল প্রমাণ করে ভারতীয় সেনা যুদ্ধ শুরু করে ভোর 5 টা থেকে।

গুলিবিদ্ধ হন মেজর শয়তান সিং

সাহসী 124 জন সৈন্যর আঘাতে একের পর এক লাশ পড়তে থাকে চিনা সেনার। প্রাথমিক আঘাত সয়ে প্রত্যাঘাত শুরু করে চিনের সেনাও। ধীরে ধীরে ভারতীয় সৈন্যদের কাছে গুলি ফুরিয়ে আসতে থাকে। হঠাৎ মর্টার ও রকেট দিয়ে গোলাবর্ষণ শুরু করে চিনা সেনা। যুদ্ধ এগোলে গুলিবিদ্ধ হন মেজর শয়তান সিং। তাকে চিকিৎসা সহায়তা দিতে চাইলেও তিনি নিজে তা অস্বীকার করে। উল্টে সৈন্যদের নির্দেশ দেন মেশিনগান নিয়ে আসতে। দুই হাতে আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন বলে পায়ের আঙ্গুলের সাথে ট্রিগার বেঁধে যুদ্ধ চালাতে থাকেন।

গুরুতর আহত হওয়ার পরেও মেজর শয়তান সিং তার পায়ে মেশিনগানের গুলি চালাচ্ছিলেন

মেজর শয়তান সিং জানতেন যে, 3000 চিনা সৈন্যের কাছে হারতে তাদের হবেই। এছাড়া রেজাং লা-তে কী ঘটেছে তা কেউই জানতেও পারবে না। এজন্য আহত দুই সৈন্য রামচন্দ্র ও নিহাল সিংকে পোস্ট ছেড়ে যেতে বলেন। তবে তারা চিনাদের হাতে বন্দী হন। চিনের সাথে এই যুদ্ধে ভারতের 124 জন সাহসী সৈন্য 1,300 চিনা সেনাকে হত্যা করে। ভারতের দিক থেকে 13 তম কুমায়ুন প্লাটুনে মাত্র 10 জন সৈন্যই জীবিত ছিলেন। এছাড়া জানা যায় যে, গুরুতর আহত হওয়ার পরেও মেজর শেতান সিং তার পায়ে মেশিনগানের গুলি চালাচ্ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে ভারত মায়ের কোলে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়েন ভারত মায়ের বীর সন্তান।

major shaitan singh

পরমবীর চক্র সম্মানে ভূষিত করা হল তাঁকে 

যদিও অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার লাশ খুঁজে পায়নি সেনা। এর 3 মাস পর বরফ গলে গেলে একটি বড় পাথরে ইউনিফর্ম পরা কিছু দেখতে পান সৈন্যরা। সেখানে পৌঁছে মেজর শেতান সিংয়ের মরদেহ উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। এরপর যোধপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মেজর শয়তান সিংকে দাহ করা হয়। উল্লেখ্য যে, চিন তার সরকারী প্রতিবেদনে স্বীকার করে যে, 1962 সালের যুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। আর আজ এতবছর পরও সেই বীরত্বের জন্য বিখ্যাত হয়ে রয়েছে রেজাং লার লড়াই। উল্লেখ্য, মাত্র 37 বছর বয়সে দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা মেজর শয়তান সিংকে দেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার ‘পরমবীর চক্র’-এ ভূষিত করা হয়েছে। এখানে ব্যাটালিয়নের আরও একজন সৈনিকের কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি হলেন তরুণ সিংহরাম। যিনি কোনও অস্ত্র ও গুলি ছাড়াই চীনা সৈন্যদের মৃত্যুর দেশে পৌঁছে দেন। সিংহরাম, মল্ল যুদ্ধে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। তিনি 10 জন চীনা সৈন্যকে চুল থেকে ধরে একটি পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেছিলেন।