বাংলাহান্ট ডেস্ক: কেরলের শ্রীকুমারের অসাধারণ সফলতার কাহিনি (Success Story) চমকে দেবে আপনাকেও।ভারতের রান্নাঘরে ব্যবহৃত মশলাগুলিকে সুগন্ধ ও স্বাদের মূল ভিত্তি বলা হয়, কিন্তু প্রায়ই সেগুলিতে ভেজালের প্রবণতা বড় উদ্বেগ তৈরি করে। এই বাস্তবতা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল কেরলের শ্রীকুমার মারঙ্গঘাট শম্ভুকে, যিনি বহু বছর ধরে এইচসিএল, ক্যাপজেমিনি ও মাইক্রোল্যান্ডের মতো সংস্থায় সফল প্রযুক্তি–ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছিলেন। শহুরে বাজারে ভেজাল মশলার ভয়াবহ প্রভাব দেখতে-দেখতে তিনি উপলব্ধি করেন যে সাধারণ মানুষের কাছে এই বিপদ সম্পর্কে সঠিক সচেতনতা নেই। শৈশবে ও যৌবনে ওয়ানাড়ের পারিবারিক খামারে যে শুদ্ধ ও সহজ জীবন তিনি দেখেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ২০২৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘‘ওয়ানাড়ক্রাফ্ট স্পাইসেস অ্যান্ড হ্যান্ডিক্রাফ্টস’—একটি অর্গানিক D2C ব্র্যান্ড, যার প্রধান লক্ষ্য বাজারে থাকা বিষমিশ্রিত ও নকল মশলার বিকল্প হিসেবে সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও প্রিমিয়াম মানের পণ্য সরবরাহ করা।
শ্রীকুমারের অনবদ্য সফলতার কাহিনি (Success Story):
বহু বছরের কর্পোরেট অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও শ্রীকুমার তাঁর পরিবারের ১৯৭৮ সাল থেকে চলা মিশ্র-ফসলের বাগানকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দাঁড় করানোর সিদ্ধান্ত নেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে এই বাগানে কঠোরভাবে জৈব ও টেকসই কৃষিচর্চা হয়ে আসছিল। প্রথম দিকে তিনি ভাবতেন, এই উৎপাদন সরাসরি পাইকারি বাজারে পাঠানো যথেষ্ট। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, এই পদ্ধতি তাঁর স্বচ্ছতা ও প্রামাণিকতার মূল নীতির বিরোধী। এরপর তিনি নিজেই মশলার প্যাকেজিং শুরু করেন এবং ছোট রিটেল পাউচ তৈরি করে ওয়ানাড় থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত পৌঁছে দিতে শুরু করেন। ব্র্যান্ডের জন্য তিনি নিজে জিএসটি, এফএসএসএআই ও এনপিওপি/পিজিএস-ইন্ডিয়া অর্গানিক সার্টিফিকেশন সংগ্রহ করেন। যদিও শুরুতে উচ্চমূল্য এবং অফলাইন দোকানগুলিকে রাজি করানো ছিল সবচেয়ে বড় বাধা, তবু তিনি পিছু হটেননি (Success Story)।
আরও পড়ুন:অপারেশন সিঁদুরের পর আতঙ্কে পাকিস্তান! সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সরানো হল ৭২ টি টেরর লঞ্চপ্যাড
২০২৩ সালে ব্র্যান্ডের অনলাইন যাত্রা শুরু হলে শ্রীকুমার ব্যবসাকে নতুন পথে পরিচালনা করেন। তিনি শুধু পণ্য বিক্রির দিকে জোর দেননি, বরং সাধারণ গ্রাহকদের ভেজালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নকল দারুচিনি—যা ক্যাসিয়া বার্ক দিয়ে তৈরি হয়—এবং বিভিন্ন ধরনের মিশ্রণযুক্ত মশলার ঝুঁকি নিয়ে তিনি প্রচুর ব্যাখ্যা দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্যবসার আগে বিশ্বাস অর্জন। ধীরে ধীরে এই শিক্ষামূলক প্রচেষ্টা ফল দিতে শুরু করে এবং ব্র্যান্ড গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে। এই সময়েই ব্র্যান্ড পুরোপুরি D2C মডেলে চলে আসে এবং জানুয়ারি ২০২৪-এ শ্রীকুমার তাঁর কর্পোরেট চাকরি ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে উদ্যোগটিকে সময় দিতে শুরু করেন (Success Story)।
ব্র্যান্ডের বিশেষত্ব হলো পণ্যের উৎস ও বিশুদ্ধতা নিয়ে আপসহীন মনোভাব। শ্রীকুমার নিশ্চিত করেন যে দারুচিনি আসে সরাসরি শ্রীলঙ্কা থেকে—যা ক্ষতিকর কৌমারিন মুক্ত এবং আসল সিলন দারুচিনির মতোই মিষ্টি ও পাতলা। তিনি কৃষকদের থেকে সরাসরি অর্গানিক পণ্য কেনেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন এবং পণ্যের মান বজায় রাখতে সহায়তা করেন। গ্রাহক বিশ্বাস অর্জনে তাঁর ব্যক্তিগত সংযোগও বড় ভূমিকা পালন করেছে—তিনি নিজে ক্রেতাদের ফোন করে পণ্যের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের সহজ পদ্ধতি শেখান। এর ফলেই ব্র্যান্ডের রেটিং দাঁড়িয়েছে ৪.৯৬/৫ এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ব্র্যান্ড জিতেছে মেট্রো ফুড অ্যাওয়ার্ড।

আরও পড়ুন: ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলায় আরও বিপাকে রাহুল-সোনিয়া! দায়ের হল অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
বর্তমানে ওয়ানাড়ক্রাফ্ট দিল্লি, গুরুগ্রাম, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, পুণে ও চেন্নাই সহ দেশের বহু শহরে পণ্য সরবরাহ করছে। ৮,০০০-এর বেশি গ্রাহকের কাছে ১৬,০০০-এর বেশি অর্ডার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। নয় জন পূর্ণকালীন কর্মী—যাঁদের মধ্যে পাঁচজন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলা—নিয়ে গড়া দলটি এখন মাসে প্রায় ১৩ লাখ টাকার আয় করছে। যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্র্যান্ডের বার্ষিক আয় ছিল মাত্র ১২ লাখ, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭২ লাখ টাকা। আগামী অর্থবছরে ২ কোটি টাকা বার্ষিক আয়ের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ব্র্যান্ড। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বিশুদ্ধ মসলা বিদেশে রফতানি করার পরিকল্পনাও রয়েছে শ্রীকুমারের, আর এই পুরো যাত্রা প্রমাণ করে কীভাবে একটি ব্যক্তিগত ভাবনা, সততা ও অধ্যবসায় একটি সম্পূর্ণ শিল্পে ইতিবাচক বদল আনতে পারে।












