বাংলা হান্ট ডেস্ক : চোরবাগানের দুর্ঘটনা (Chorbagan Incident) শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বৈদ্যবাটির একটি পরিবারকে ঠেলে দিয়েছে গভীর শোকের মধ্যে। দরজার দিকে তাকিয়ে এখনও শ্রীপর্ণার অপেক্ষা করছে পোষ্য পপি। তার প্রিয় মানুষটি আর ফিরবে না, অথচ সেই সত্যিটা যেন মেনে নিতে পারছে না অবলা প্রাণীটি। অন্যদিকে, মেয়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন মা স্বপ্না পোদ্দার। পুজোর আনন্দে মাকে চমকে দেওয়ার যে পরিকল্পনা করেছিলেন শ্রীপর্ণা, তা আর পূরণ হল না।
চোরবাগানের দুর্ঘটনায় (Chorbagan Incident) শ্রীপর্ণার স্বপ্ন অপূর্ণই রয়ে গেল
বৈদ্যবাটির মালির বাগানের বাসিন্দা ২৬ বছরের শ্রীপর্ণা পোদ্দার সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানেই পদপিষ্ট হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার পর বেশ কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারেনি পরিবার। বাড়ির প্রবেশপথের কাছেই রাখা মেয়ের ছবির সামনে বারবার গিয়ে বসেন স্বপ্না। পুরনো অ্যালবাম ঘেঁটে বের করেন শ্রীপর্ণার আঁকা ছবি। মেয়ের স্পর্শ লেগে থাকা এই সামান্য জিনিসগুলিই এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় সম্বল।
শ্রীপর্ণার বাবা সোমনাথ পোদ্দার কাপড়ের ব্যবসা করেন। মা স্বপ্না একসময় নার্সের কাজ করতেন, তিন বছর আগে অবসর নিয়েছেন। মেয়ের সঙ্গে কাটানো দিনগুলির কথা মনে পড়লেই ফিরে আসে পুজোর ছুটির নানা মুহূর্ত। স্বপ্না পোদ্দার বলেন, “পুজোর ছুটিতে বাড়ি এলে ঠাকুর দেখার মাঝেও রান্না করতে ভালোবাসতো। আমি ঠাকুরকে বলি, এমন দিন যেন কারোর না আসে। সকালে মেয়েকে সাজিয়ে পাঠালাম, সন্ধ্যায় আর ওকে দেখার মতো পরিস্থিতি ছিল না। ছোট থেকে আঁকতে ভালোবাসতো। কার্টুন দেখে আঁকার প্রতি ভালোবাসা এসেছিল। শাড়ি পরতে বেশি ভালোবাসতো। বাড়ির পোষ্য পপি, সেও অপেক্ষা থাকতো দিদির।”
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শ্রীপর্ণার অনুপস্থিতি যেন সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে বাড়ির পোষ্য পপি। বাড়ি ফিরলেই পপির জন্য মিষ্টি নিয়ে আসতেন শ্রীপর্ণা। সেই পরিচিত অভ্যাসের অপেক্ষায় হয়তো এখনও রয়েছে সে। পরিবারের কথায়, আগে বাড়িতে অপরিচিত কাউকে দেখলেই চিৎকার করে উঠত পপি। এখন তার সেই চঞ্চলতা নেই, খাওয়াদাওয়াও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। বাড়ির মানুষদের কাছে এই বদলে যাওয়া আচরণ আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, শ্রীপর্ণা কতটা জুড়ে ছিলেন তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে।
মেয়ের আরেকটি পরিচয় ছিল তাঁর শিল্পীসত্তা। ছোটবেলায় কার্টুন দেখে ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরে হোস্টেলে থাকাকালীনও সময় পেলেই আঁকার জন্য বসতেন তিনি। এবারের পুজোয় মাকে বিশেষ কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। সেই উদ্দেশ্যেই আঁকছিলেন বেনারসের সন্ধ্যার আরতির দৃশ্য। ছবিটি শেষ করে মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই থেমে গেল তাঁর পথচলা।

আরও পড়ুন : চোরবাগানে দশমীতেও নিভে রইল আলো! পুলিশি ঘেরাটোপে মণ্ডপ, কবে বিসর্জন?
মেয়ের সেই অসমাপ্ত কাজের কথা বলতে গিয়ে স্বপ্না বলেন, “খুব শৌখিন ছিল মেয়ে, বেনারসের একটা ছবি আঁকছিল। যে হোস্টেলে থাকতো সেখানে সময় পেলে একটু একটু করে আঁকতো। বেনারসের সন্ধ্যা আরতি ছবি আঁক ছিল। কিন্তু সেটা আর দেওয়া হল না।”
এখন সেই ছবির বাকি অংশ আর কোনও দিন শ্রীপর্ণার হাতে পূর্ণতা পাবে না। মায়ের জন্য রাখা উপহারটি থেকে গেল অপূর্ণ।













