টাইমলাইনপশ্চিমবঙ্গ

বিদ্যাসাগরের অজানা দিক; কাকা তারানাথের উদ্দেশ্যে বই লিখলেন ভাইপো ঈশ্বরচন্দ্র, হেসেই অস্থির কলকাতাবাসী

পন্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Iswar Chandra Vidyasagar) , ছোটখাটো মানুষটি একা হাতে বদলে দিয়েছিলেন দেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সমাজকে। বিধবা বিবাহ প্রচলন করে বহু যুগ ধরে চলে আসা কুপ্রথার মূলে তিনি যেমন আঘাত করেছিলেন, তেমনই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন নারী শিক্ষা বিস্তারেও। আবার বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকারও তিনি।

বিদ্যাসাগরের জীবনের অনেক কাহিনিই আমরা জানি – মাইলফলক দেখে সংখ্যা শেখা , রাস্তার আলোতে পড়াশোনা থেকে ব্রিটিশ সাহেবকে সমুচিত জবাব। কিন্তু বিদ্যাসাগরের এসব দিকের অন্তরালে চাপা পড়েছে আরো একটি দিক, বিদ্যাসাগরের রসিকতা। ‘খুড়’ – ‘ভাইপো’ সম্মন্ধ পাতিয়ে বিদ্যাসাগর তারানাথ তর্কবাচস্পতির উদ্দেশ্যে যে দুখানি বই লিখেছিলেন, তেমন উচ্চমানের রসিকতা বাংলা সাহিত্যে বিরল।

আপাতভাবে মজার হলেও যে বিষয়টি নিয়ে বই দুটি লেখা তা কিন্তু বেশ গুরু-গম্ভীর। বহু বিবাহ নিয়ে সেই সময় বিদ্যাসাগর হুলুস্থুল বাঁধিয়েছেন বাংলার সমাজে। বহুবিবাহকে একের পর এক আক্রমণ করে বই লিখে চলেছেন তিনি। আর তাতে তীব্র শ্লেষে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছেন তৎকালীন ধর্মরক্ষকরা। এমন সময় বিদ্যাসাগরের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হলেন তারানাথ বাচস্পতি। বহু বিবাহের সমর্থনে তিনি লিখে ফেললেন বই। তাও আবার ভুলে ভরা সংস্কৃতে।

একে তো তর্কযুদ্ধ তার ওপর ভুলে ভরা সংস্কৃত ভাষায় বই; এ সুযোগ হাতছাড়া করলেন না বিদ্যাসাগর। বাচস্পতি মশাইয়ের সংস্কৃতজ্ঞানকে কৌতুক করে বিদ্যাসাগর লিখলেন ‘অতি অল্প হইল’। যার শুরুটা তিনি করলেন ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য প্রণীত’ বলে কাকা-ভাইপো সম্মন্ধ পাতিয়ে। এই বইয়ে কোথাও তারানাথের নাম উল্লেখ করে আক্রমণ নেই। ‘খুড়’ সম্মোধন করে যেভাবে বিদ্যাসাগর একের পর এক ব্যঙ্গের জাল বুনেছেন, তাতে অনেকেরই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এই বই বিদ্যাসাগরের রচনা।

‘খুড়’ সম্মোধনে এই ব্যঙ্গে তো চটে লাল বাচস্পতি মশাই। তিনি পাকড়ালেন ‘ভাইপোস্য’ শব্দটিকে। লিখলেন, ঐ শব্দ সংস্কৃতে নেই সুতরাং বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতজ্ঞানও নেই। কিন্তু বাচস্পতি মশাই জানতেন না, বিদ্যাসাগর ইচ্ছে করেই ‘ভাইপোস্য’ ফাঁদ পেতেছিলেন তার জন্য। আর সেই ফাঁদে পা দিতেই কয়েকদিনের মধ্যে বেরোল ‘আবার অতি অল্প হইল’.

আর এখানে তিনি যে ব্যাখা দিলেন তা পড়লে চমকে উঠতে হয়, ”খুড়, এত বড় পণ্ডিত ও এত বড় বুদ্ধিশীল হইয়া, কোন বিবেচনায়, ‘ভাইপোস্য’ এই বিশুদ্ধ প্রয়োগটিকে অশুদ্ধ বলিয়া নির্দ্দেশ করিলেন, বুঝিয়া উঠা কঠিন। ‘ভাইপোস্য’ এই প্রয়োগটি দুটি সংস্কৃত পদে ঘটিত। ‘ভাইপঃ’, ‘অস্য’, এই দুই পদে সন্ধি হইয়া, ‘ভাইপোস্য’ প্রয়োগটি সিদ্ধ হইয়াছে। ভা শোভা, ইঃ কামঃ, অভিলাষ ইতি যাবৎ, তৌ পাতি রক্ষতি ইতি ইতি ভাইপাঃ, তস্য ভাইপঃ।

‘সন্ধিস্তু পুরুষেচ্ছয়া’ এই ব্যবস্থা বশতঃ, লেখকের ইচ্ছাবিরহ হেতু, ‘ভা’ ‘ই’ এই দুয়ের সন্ধি হইল না। ইহার অর্থ এই, অস্য কি না খুড়স্য, ভাইপঃ শোভাবিলাষরক্ষিতুঃ; অর্থাৎ, খুড়র পাণ্ডিত্যশোভার ও প্রতিপত্তিলাভবাসনার রক্ষাকর্তার। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ সমুদয়ের অর্থ, খুড়র উপযুক্ত পাণ্ডিত্যশোভা ও প্রতিপত্তিলাভবাসনার রক্ষাকর্তা কোনও ব্যক্তির।”

এই বিকট যুক্তির ভিতরে ‘খুড়’ কে তিনি যেভাবে ঠাট্টা করেছেন তা জেনে অবাক হতে হয়। এই বইটির ছত্রে ছত্রেও রয়েছে বহু বিবাহের প্রতি তীব্র শ্লেষ। বলা বাহুল্য, এমন জবাব পেয়ে ভাইপোটিকে আর ঘাঁটাতে যান নি বাচস্পতি মশাই, রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন তিনি।

 

Back to top button