বাংলা হান্ট ডেস্কঃ রাজ্য বার কাউন্সিলের (West Bengal State Bar Council) নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নামজাদা আইনজীবী। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন গোটা আইনজীবী মহল উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। নির্বাচন হবে কি না, এখন সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী-মন্ত্রীদের নাম নেই, চরম ক্ষোভ আইনজীবী মহলে (West Bengal State Bar Council)
খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই চমক। তালিকায় নেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। বাদ গিয়েছেন সাংসদ সৌগত রায় এবং বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামও। এঁরা সকলেই দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবী হিসেবে পরিচিত এবং বার অ্যাসোসিয়েশনের (West Bengal State Bar Council) সঙ্গে যুক্ত। আইনজীবীদের একাংশের দাবি, এত বড় মাপের নাম বাদ পড়া কোনোভাবেই সাধারণ ভুল হতে পারে না। তাঁদের অভিযোগ, বোর্ড ইচ্ছাকৃতভাবেই ভোটার তালিকায় কারচুপি করেছে।
ভোটার তালিকায় সংখ্যার অমিল, উঠছে গুরুতর প্রশ্ন
২০১৮ সালের শেষ রাজ্য বার কাউন্সিল (West Bengal State Bar Council) নির্বাচনে প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবী ভোট দিয়েছিলেন। অথচ এত বছর পর নতুন খসড়া তালিকাতেও ভোটারের সংখ্যা সেই ৩০ হাজারের কাছাকাছিই। আইনজীবীদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে বহু নতুন আইনজীবী পাশ করে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই ভোটারের সংখ্যা কমপক্ষে ৫৫ হাজার হওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ, নতুনদের নাম তো নেইই, উল্টে পুরনো তালিকা থেকে ১৭ থেকে ২০ হাজার বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পিত চক্রান্তের অভিযোগ তৃণমূলপন্থী আইনজীবীদের
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য লিগ্যাল সেলের প্রাক্তন আহ্বায়ক তরুণ চট্টোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, জেলায় জেলায় সাধারণ আইনজীবীদের পাশাপাশি বহু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামও তালিকায় নেই। তাঁর দাবি, কিছু কাউন্সিল (West Bengal State Bar Council) সদস্য হিসেব করে এমন তালিকা বানিয়েছেন যাতে নতুন ও নিরপেক্ষ আইনজীবীরা ভোট দিতে না পারেন। তবে এই চক্রান্ত সফল হতে দেবেন না সাধারণ আইনজীবীরা, এমনই দাবি তাঁর।
ফি নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু ভোটাধিকার নেই?
আইনজীবী সুবীর সেনগুপ্ত দীর্ঘদিন ধরেই বার কাউন্সিলের (West Bengal State Bar Council) নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব। তাঁর অভিযোগ, কাউন্সিল আইনজীবীদের কাছ থেকে নিয়মিত মেম্বারশিপ ফি নেয়, জুনিয়র আইনজীবীদের কাছ থেকেও বাড়তি ফি নেওয়া হয়। কিন্তু তার পরেও অনেকের নাম ভোটার তালিকায় থাকে না। এই বিষয় নিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছেন।
‘সার্টিফিকেট অফ প্র্যাক্টিস’ নিয়ে দ্বিচারিতার অভিযোগ
বার কাউন্সিল নির্বাচনের (West Bengal State Bar Council) অন্যতম শর্ত হলো ‘সার্টিফিকেট অফ প্র্যাক্টিস’ (COP)। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এই শংসাপত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। আইনজীবীদের অভিযোগ, ২০১৬ সালে ৩০০ টাকা করে নেওয়া হলেও দীর্ঘদিন কাউকে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়নি। অথচ যাঁরা এখন নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই বৈধ COP নেই। এখানেই উঠছে দ্বিচারিতার প্রশ্ন। এমনকি বর্তমান চেয়ারম্যান অশোক দেবের নাম ভোটার তালিকায় থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
হাই কোর্টে মামলা, ৭ জানুয়ারি শুনানি
ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের বেঞ্চে শাসক ও বিরোধী, সব পক্ষের আইনজীবীরাই দাবি জানিয়েছেন, সঠিক ভোটার তালিকা ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয়। আদালত জানিয়েছে, আগামী ৭ জানুয়ারি এই মামলার শুনানি হবে। আইনজীবীদের দাবি, অন্তত ২০ হাজার নাম যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৯, ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত ভোটের আগে সমস্যার সমাধান না হলে নির্বাচন নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্ট আগেই নির্দেশ দিয়েছে, মার্চের মধ্যে রাজ্য বার কাউন্সিলের (West Bengal State Bar Council) নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচনের তদারকিতে মণিপুর হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি কৃষ্ণকুমার এবং কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অসীম কুমার রায়কে দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। যদিও বিচারপতি রায়ের সম্মতি এখনও মেলেনি। অনিয়মের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যের প্রায় সব জেলা আইনজীবী সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। বার কাউন্সিলকে চিঠি দিয়ে আপত্তিও জানানো হয়েছে। শুক্রবার কাউন্সিল অফিসে বিক্ষোভ দেখানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। বার কাউন্সিলের সহকারী সম্পাদক পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত সময়সীমা বাড়ানো হবে কি না, তা পরে জানানো হবে। অভিযোগ থাকলে আইনজীবীদের সরাসরি অফিসে এসে কথা বলতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ দেবের কেন্দ্রে বড় ভাঙ্গন! লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ছেড়ে বিজেপিতে শতাধিক মহিলা, কী এমন ঘটল ঘাটালে?
এই নির্বাচন এখন শুধু জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন নয়। অনেকের মতে, এটি আইনি পেশার স্বচ্ছতা ও মর্যাদার লড়াই। মনোনয়ন ফি ৩০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করাও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এখন সব নজর ৭ জানুয়ারির দিকে। হাই কোর্ট কী নির্দেশ দেয়, তার উপরই নির্ভর করছে রাজ্য বার কাউন্সিল (West Bengal State Bar Council) নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।












