বাংলাহান্ট ডেস্ক: পাকিস্তানে (Pakistan) বসবাসকারী হিন্দু-সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে ফের বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারির (Asif Ali Zardari) একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা। জারদারি দাবি করেছেন, পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুরা ভারতে (India) থাকা হিন্দুদের তুলনায় বেশি সুখে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পাকিস্তানের মুসলিম সমাজ অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীল এবং সে কারণেই সেখানে হিন্দুরা স্বাধীন ভাবে বসবাস করেন। রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছে, বাস্তবে পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি কতটা স্বচ্ছন্দ এবং নিরাপদ।
পাকিস্তানে (Pakistan) হিন্দুদের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন প্রাক্তন কূটনীতিক
জারদারির বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক কেপি ফ্যাবিয়ান। তাঁর মতে, কোনও দেশের নাগরিকের অধিকার বা মর্যাদা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম কখনও মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। পাকিস্তান (Pakistan) ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ঘটনা সেই রাষ্ট্রভাবনার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে এনেছিল। তাঁর যুক্তি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার বিচ্ছিন্ন হয়ে বাংলাদেশ তৈরি হওয়া দেখিয়ে দিয়েছিল যে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখা যায় না। ইতিহাসের সেই ঘটনাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয় ঠিকই, কিন্তু সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
আরও পড়ুন: যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যের পথে ভারত? ক্রমশ বাড়ছে জনসংখ্যার বয়স, কী জানাল সমীক্ষা?
ফ্যাবিয়ানের বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর থেকেই সেখানে সমস্ত নাগরিককে ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ সব ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। তাঁর মতে, কোনও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সংখ্যালঘু নাগরিকের মধ্যে যদি ধর্মের ভিত্তিতে পার্থক্য তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় সংখ্যালঘুরা স্বাধীন ও নিরাপদ বলে দাবি করলেই পরিস্থিতির প্রকৃত ছবি স্পষ্ট হয় না। রাষ্ট্রের আইন, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যেই সেই দাবির সত্যতা যাচাই করা যায়।
এখানেই জারদারির বক্তব্য নিয়ে ফ্যাবিয়ানের আপত্তি আরও তীব্র হয়েছে। কারণ তাঁর মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি নিজেই যদি দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থান নিয়ে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেন, তাহলে তা বিষয়টির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। জারদারি তাঁর স্বাধীনতা দিবসের বক্তব্যে বলেন, পাকিস্তানের জনসংখ্যার প্রায় চার শতাংশ হিন্দু এবং তাঁরা দেশের অন্য নাগরিকদের মতোই স্বাধীন। একই সঙ্গে ভারতের কিছু মানুষের ‘অখণ্ড ভারত’-এর ধারণার উল্লেখ করে তিনি পাকিস্তানের মুসলিম সমাজকে তুলনামূলক ভাবে বেশি সহনশীল বলে তুলে ধরেন। এমনকি তিনি ব্যক্তিগত ভাবে ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে বেশি পছন্দ করবেন বলেও মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানে ধর্মীয় সহাবস্থানের একটি ইতিবাচক ছবি তুলে ধরা।

আরও পড়ুন: সরকার কনটেন্ট মুছে ফেলতে বললেই ‘এক্স’ ব্যবহারকারীদের জানানো হবে কারণ! ঘোষণা মাস্কের
তবে জারদারির এই দাবি এবং ফ্যাবিয়ানের পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই ফের সামনে এসেছে উপমহাদেশের ধর্ম ও রাজনীতির পুরনো বিতর্ক। পাকিস্তানে হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান-সহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে ভারত-পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের আবহে দুই দেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য শোনা যায়। ফ্যাবিয়ানের বক্তব্যের মূল সুর অবশ্য একটি বিষয়েই—অতীতের ইতিহাস বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু ভবিষ্যতের রাষ্ট্রব্যবস্থা আরও সমানাধিকারভিত্তিক করা সম্ভব। তাঁর মতে, নাগরিকের পরিচয় যে ধর্মেরই হোক না কেন, রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেকের অধিকার ও মর্যাদা সমান হওয়াই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান শর্ত (Pakistan)।













