বাংলাহান্ট ডেস্ক: লোহিত সাগর (Red Sea) ঘিরে ফের তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বাব-এল-মান্ডেব প্রণালী (Bab-al-Mandab Strait) নিয়ে। ইয়েমেনে (Yemen) ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধাদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বাব আল-মান্ডেব প্রণালী নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছে। গত শুক্রবার হুথি বাহিনী মোচা থেকে ধুবাব পর্যন্ত এগিয়ে যায় বলে খবর। একইসঙ্গে বাব আল-মানদেবের মাঝামাঝি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা মায়ুন বা পেরিম দ্বীপেও তাদের উপস্থিতির কথা সামনে এসেছে। এই দ্বীপটি এমন একটি কৌশলগত জায়গায় অবস্থিত, যেখান থেকে প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের গতিবিধির ওপর নজর রাখা সম্ভব। যদিও হুথিরা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বাব আল-মান্ডেবের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা করেনি, তাদের এই অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
হুথিরা লোহিত সাগর দখল করায় যেকোনও সময়ে বন্ধ হতে পারে বাব আল-মান্ডেব (Bab-al-Mandab Strait):
বাব আল-মান্ডেবকে (Bab-al-Mandab Strait) লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার বলা হয়। এই সরু জলপথ এডেন উপসাগরকে লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং সেখান থেকেই বাণিজ্যিক জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের দিকে যেতে পারে। ফলে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য এবং জ্বালানি পরিবহণের ক্ষেত্রে এই প্রণালীর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা থাকায় বাব আল-মান্ডেবের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে তাই এই জলপথে কোনও ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা নতুন করে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন: আকাশে চপার-ড্রোন! সর্বত্র মোতায়েন শার্প শুটার, ব্রিকস ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিল্লিতে
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার সূত্রপাত হয় বৃহস্পতিবার সকালে। ইয়েমেনি সরকারি সূত্রের দাবি, হুথি যোদ্ধারা প্রথমে মোচায় পৌঁছয় এবং সেখান থেকে আশপাশের দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকার দিকে এগিয়ে যায়। পরে বাব আল-মান্ডেব উপকূলের কাছে অবস্থিত ধুবাব দ্বীপেও তাদের উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। এরপর মায়ুন বা পেরিম দ্বীপে হুথিদের পৌঁছে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, বাব আল-মান্ডেব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও তারা সম্পন্ন করেছে। তবে এই দাবির পাশাপাশি এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, হুথি পক্ষ এখনও প্রণালীটির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি। ফলে মাটিতে তাদের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণের পরিধি নিয়ে এখনও কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
লোহিত সাগরের জলপথে হুথিদের তৎপরতা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও তাদের হামলার কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং বহু বাণিজ্যিক জাহাজকে বিকল্প দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হয়েছে। এবার কৌশলগত উপকূল ও দ্বীপ এলাকায় তাদের উপস্থিতি বাড়লে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলির ওপর চাপ প্রয়োগের ক্ষমতাও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদিও হুথি নেতা হাজেম আল-আসাদ দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যের জন্য তারা কোনও হুমকি নয় এবং বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল নিরাপদ। ফলে একদিকে হুথিদের এই দাবি, অন্যদিকে তাদের সামরিক অগ্রগতি—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া পার্থক্যই পরিস্থিতিকে আরও নজরকাড়া করে তুলেছে।

আরও পড়ুন: পাকিস্তান-বাংলাদেশের উড়ল ঘুম! জিনপিং ভারতে পৌঁছনোর আগেই বন্ধুত্বের বার্তা দিল চিন
এরই মধ্যে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বাব আল-মান্ডেব (Bab-al-Mandab) উত্তেজনা আরও বাড়লে বা জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণের খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে ওঠার আশঙ্কার কথাও সামনে এসেছে। সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ধাক্কা লাগলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে আটকে থাকবে না; বিশ্ব বাণিজ্য, পরিবহণ খরচ এবং মুদ্রাস্ফীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির জবাবে ইয়েমেন সরকার এখনই বড় ধরনের পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন স্পষ্ট কোনও ইঙ্গিতও এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে আগামী দিনে বাব আল-মান্ডেব ঘিরে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তার ওপরই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করছে।













