বাংলা ওহান্ট ডেস্ক: বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম নিয়ে উদ্বেগ এখনও কাটেনি। গত ছ’মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি পৌঁছনোর পর সোমবার কিছুটা স্বস্তি মিলেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। এ দিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুডের দাম ২.১১ শতাংশ বা ২.১৭ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১.০৯ ডলারে নেমে আসে। একই ভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ১.৮৫ শতাংশ বা ২.১৬ ডলার কমে ব্যারেলপ্রতি ১১৪.৫০ ডলারে দাঁড়ায়। তবে এই পতনকে তেলের বাজারে সংকটের অবসান হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। সৌদি আরবের (Saudi Arabia) তেল পরিকাঠামো ও বিমানবন্দরকে ঘিরে হামলার আশঙ্কা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আমেরিকা-ইরান সংঘাতের সম্ভাবনা এখনও বাজারকে অস্থির করে রেখেছে। ফলে সাময়িক স্বস্তি মিললেও আগামী দিনে তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের উত্তেজনার আবহেই অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দামে বড় পতন!
সোমবারের এই পতনের পিছনে শুক্রবারের বড়সড় মূল্যবৃদ্ধির পর বাজারে কিছুটা সংশোধনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হুথি বিদ্রোহীদের হামলার আশঙ্কায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩ ডলার বেড়ে গিয়েছিল। চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৬ শতাংশ এবং WTI-এর দাম ২.৩ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই উত্থানের পর কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নেওয়ায় দামে সাময়িক পতন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের আসন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তের আগে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা তৈরি হয়েছে। তবে বাজারের এই ওঠানামার নেপথ্যে শুধু আর্থিক হিসাবনিকাশ নয়, পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সৌদি আরবের দাবি, রবিবার তারা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। এর আগে হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার দাবি করেছিল। বিমানবন্দরটি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আংশিকভাবে চালু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে শক্তি বাড়াচ্ছে ‘অর্ণব’, অন্ধ্র-ওড়িশায় সর্তকতা, কতটা প্রভাবিত হবে বাংলা?
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অপরিশোধিত তেলের দাম কি ফের ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছতে পারে? বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং তেল উৎপাদন ও রপ্তানি পরিকাঠামোর পরিস্থিতির উপর। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথগুলির মধ্যে অন্যতম এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বড়সড় বাধা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তেমন পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। অন্যদিকে, পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমলে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দামে উল্লেখযোগ্য পতনও হতে পারে। রেলিগেয়ার ব্রোকিংয়ের গবেষণা বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট অজিত মিশ্রের মতে, বর্তমানে তেলের বাজার মূলত দৈনিক খবর ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে চলছে। তাই বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ দামের উত্থান দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, মার্কিন ফেডের অবস্থান এবং সাপ্তাহিক তেলের মজুতের তথ্যের দিকে নজর রাখা উচিত।
এদিকে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কাও বাজারকে প্রভাবিত করছে। মতিলাল ওসওয়াল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের পণ্য গবেষণা বিভাগের প্রধান নভনীত দামানির বক্তব্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী এবং সৌদি আরবের আশপাশে হামলার আশঙ্কা তেল স্থাপনা ও রপ্তানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামো এবং নাতাঞ্জের কাছাকাছি পারমাণবিক স্থাপনাকে নিশানা করার পরিকল্পনা করতে পারে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ইরানও পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আমেরিকা বা ইজরায়েল হামলা চালালে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাই তেলের দামে ঝুঁকির প্রিমিয়াম বাড়িয়ে রাখছে। অর্থাৎ, সরবরাহে বাস্তব ঘাটতি তৈরি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় দাম বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন: ব্রাজিলে ফের বাজিমাত বামপন্থীদের! ইতিহাস গড়ে চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন লুলা দ্য সিলভা
তেলের দাম (Crude Oil) নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক স্তরে একাধিক পদক্ষেপের কথাও সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) জরুরি মজুত থেকে আরও তেল বাজারে আনার পক্ষে সওয়াল করেছে। অন্যদিকে, জি৭ দেশগুলির অতিরিক্ত ১০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাজারে প্রকৃত সরবরাহ কতটা বাড়বে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে রুশ ডিজেলের প্রথম চালান পৌঁছনোর পরেও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পুরোপুরি থামেনি বলে দাবি করা হয়েছে। কারণ, শুধু ঘোষণা করলেই বাজারে জ্বালানির জোগান বাড়ে না; পরিবহণ, জাহাজের নিরাপত্তা এবং রপ্তানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও জরুরি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে কিছুটা উন্নতি হলেও অতিরিক্ত পরিবহণ খরচ ও নিরাপত্তার ঝুঁকি এখনও বড় বাধা। তাই সোমবারের মূল্যপতন আপাতত সাময়িক স্বস্তি দিলেও, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা বজায় থাকার আশঙ্কাই বেশি।














