বাংলাহান্ট ডেস্ক: দেশীয় যুদ্ধবিমান ও সামরিক ড্রোনের জন্য নিজস্ব ইঞ্জিন তৈরির দীর্ঘ প্রচেষ্টায় আরও এক ধাপ এগোল ভারত (India)। রাশিয়ায় (Russia) উচ্চ উচ্চতা ও আকাশে পরীক্ষার সময় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাল ডিআরডিও-র অধীন জিটিআরই-র তৈরি কাবেরি ড্রাই ইঞ্জিন (Kaveri Engine)। পরীক্ষায় ইঞ্জিনটি সর্বোচ্চ ৪৮.৫ কিলোনিউটন শক্তি উৎপন্ন করেছে। যেখানে পরীক্ষার নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল প্রায় ৪৬ কিলোনিউটন। অর্থাৎ প্রত্যাশিত মাত্রার থেকেও বেশি শক্তি দেখিয়েছে নতুন সংস্করণের এই ইঞ্জিন। এখন এই প্রযুক্তিকে ভারতের পরিকল্পিত স্টেলথ যুদ্ধ ড্রোন ‘ঘাতক’-এর সঙ্গে যুক্ত করার পথেই এগোচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।
রাশিয়ায় পরীক্ষায় সফল দেশীয় কাবেরি ইঞ্জিন (Kaveri Engine), নতুন নজির ভারতের
রাশিয়ায় এবারের পরীক্ষা একাধিক ধাপে চালানো হয়েছে। প্রথমে সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অব এভিয়েশন মোটরসে উচ্চ উচ্চতার পরিবেশ তৈরি করে ইঞ্জিনটির কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। এরপর গ্রোমভ ফ্লাইট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে আকাশে পরীক্ষা চালানো হয়। এর জন্য পরিবর্তিত ইলিউশিন আইএল-৭৬ বিমান ব্যবহার করা হয়েছিল। বিমানের একটি মূল ইঞ্জিনের জায়গায় কাবেরি বসিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার কার্যক্ষমতা পরখ করা হয়। বায়ুচাপের পরিবর্তন, বিমানের গতি এবং বিভিন্ন মাত্রার শক্তির চাহিদার মধ্যে ইঞ্জিনটি কতটা স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে, মূলত সেটিই যাচাই করা হয়েছে। ৪৮.৫ কিলোনিউটন শক্তি পাওয়ায় পরীক্ষার ফলাফলকে কাবেরি প্রকল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে (Kaveri Engine)।
আরও পড়ুন: বিপর্যয় এড়াতে নেপালের ৪ হিমবাহ হ্রদ থেকে কমানো হচ্ছে জল! আরও ১৭ টি রয়েছে বিপজ্জনক অবস্থায়
তবে কাবেরির এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে প্রায় চার দশকের দীর্ঘ গবেষণা। দেশীয় হালকা যুদ্ধবিমান তেজসের জন্যই প্রথম এই ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৮৯ সালে সরকারি অনুমোদন মেলে। প্রথম পরিকল্পনা ছিল আফটারবার্নার-সহ একটি টার্বোফ্যান ইঞ্জিন তৈরি করা। কিন্তু উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করতে সক্ষম উপাদান, টারবাইন ব্লেড, কম্প্রেসর প্রযুক্তি এবং ইঞ্জিনের ওজনের সঙ্গে শক্তির সামঞ্জস্য—একাধিক প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়ে প্রকল্পটি। তেজসের জন্য মূল কাবেরি ইঞ্জিনে প্রায় ৮১ কিলোনিউটন শক্তির প্রয়োজন ছিল। পরীক্ষায় প্রায় ৭০ কিলোনিউটনের কাছাকাছি শক্তি পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হয়নি।
এরপর প্রকল্পটি বন্ধ না করে কাবেরির নতুন সংস্করণ তৈরির দিকে এগোয় ডিআরডিও। তৈরি হয় কাবেরি ডেরিভেটিভ ইঞ্জিন বা কেডিই। মূল কাবেরির মতো এতে আফটারবার্নার নেই। ফলে অতিরিক্ত থ্রাস্টের প্রয়োজন হয় না, এমন বিমান বা আকাশযানের জন্য এই ইঞ্জিনকে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হয়। সেই লক্ষ্যেই এবার কাবেরির নতুন সংস্করণকে ‘ঘাতক’ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারতের পরিকল্পিত স্টেলথ আনম্যানড কমব্যাট এয়ার ভেহিকল বা ইউসিএভি হিসেবে ঘাতকের ক্ষেত্রে কম ওজনের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ও নির্দিষ্ট ক্ষমতার ইঞ্জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাবেরির নতুন সংস্করণ সেই প্রয়োজন কতটা পূরণ করতে পারে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আরও পড়ুন:মুহূর্তের মধ্যে নেমে এল টন টন পাথর! উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ে ভয়াবহ ধস, প্রকাশ্যে এল ভিডিও
তবে রাশিয়ার পরীক্ষায় সাফল্য মিললেও কাবেরির পথ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। ইঞ্জিনটি সামরিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত বলে ঘোষণা করার আগে আরও পরীক্ষা, এয়ারওয়ার্দিনেস যাচাই এবং প্রয়োজনীয় শংসাপত্রের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। পরীক্ষার তথ্য খতিয়ে দেখবে সেন্টার ফর মিলিটারি এয়ারওয়ার্দিনেস অ্যান্ড সার্টিফিকেশন বা সিইএমআইএলএসি। তারপরই চূড়ান্ত সংযুক্তিকরণ ও ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কাবেরি কর্মসূচির অধীনে ইতিমধ্যেই একাধিক প্রোটোটাইপ তৈরি হয়েছে এবং ৩২০০ ঘণ্টারও বেশি পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ফলে তেজসের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণ করতে না পারলেও কাবেরি প্রকল্প থেকে তৈরি প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা এখন নতুন সামরিক প্ল্যাটফর্মে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করেছে। রাশিয়ায় ৪৮.৫ কিলোনিউটন শক্তি পাওয়ার ঘটনা সেই দীর্ঘ যাত্রায় নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ (Kaveri Engine)।













