Durga Puja 2026 Live Updates

মনোজ আগরওয়ালকে ‘ভোট চোর’ কটাক্ষ মহুয়ার! তৃণমূলের ১৫ বছরে কী কী ঘটেছিল? সব হিসেব সামনে

Published on:

Published on:

mahua Moitra(1)
Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রর (Mahua Moitra) ‘ভোট চোর’ মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে। যার জল ইতিমধ্যেই গড়িয়েছে আদালত অবধি। গত ৩ অক্টোবর ও ৬ অক্টোবর দু’দফায় রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে (Manoj Kumar Agarwal) ‘ভোট চোর’ বলে উল্লেখ করে তোপ দাগেন তৃণমূলের মহুয়া। আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে সরগরম হয়ে ওঠে রাজ্য রাজনীতি। কিন্তু ‘ভোট চোর’ বলা এই মহুয়া মৈত্র ও তাঁর দলের আসল ছবি কী? দেখে নেওয়া যাক।

কী দাবি মহুয়ার? Mahua Moitra

মহুয়ার পোস্টের সারমর্ম হল, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তাঁর ‘মালিকের’ অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অঙ্গুলিহেলনে ভোটার তালিকায় ‘কারচুপি’ করেছেন। বাংলার ভোটার থেকে সাধারণ নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে মহুয়া লেখেন, “আপনার নজরদারিতেই এটা ঘটেছে মনোজ আগরওয়াল। ভোট চোর।”

এই ঘটনায় আলিপুর আদালত গত ১৫ অক্টোবর মহুয়ার মন্তব্যগুলির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। যদিও মহুয়ার স্পষ্ট কথা, “একজন ‘ভোট চোর’-কে ‘ভোট চোর’ বলার অধিকার আরও জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা” করার কথা বলবেন তিনি। তবে এই প্রথম নয়, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জনগণের রায়ে মুখ থুবড়ে পড়ার পর থেকে তৃণমূলের একের পর এক নেতারা ২০২৬-এর জনাদেশকে চুরি এবং যে আধিকারিকেরা ‘স্বচ্ছ’ ভোটার তালিকায় ভোট করিয়েছেন তাঁদের ‘চোর’ দাগিয়ে দেওয়ার ক্রমাগত প্রচেষ্টা চলছে।

মহুয়ার আগে তাদের দলনেত্রী, রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েনদের গলাতেও কিছুটা একই সুর শোনা গিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ফেসবুক লাইভ করে ২০২৬-এর নির্বাচনকে “লুট” বলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গ্রেপ্তারির দাবি করেছেন। SIR-এর আগের ভোটার তালিকায় পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে নির্বাচনেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে মহুয়া সহ মমতা তৃণমূলের এই সকল দাবি আবার তৃণমূলের দিকেই বুমেরাং হয়ে আসতে শুরু করেছে এবারে। কীভাবে?

ফিরে যাওয়া যাক তৃণমূল সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনকালে। তৃণমূলের নিজের রেকর্ডই বলে দিচ্ছে প্রকৃত ভোট চোর কে বা কারা? ২০১৮ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় ৫৮,৬৯২টি আসনের মধ্যে ২০,১৫৯টিতে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। এর মধ্যে প্রায় ২০,০০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই জিতে গিয়েছিল তৎকালীন শাসকদল। যার মানে প্রায় ৩৪ শতাংশ আসনে কোনো ভোটই হয়নি।

bayron biswas

সাধারণ মানুষের অভিযোগের পাহাড় জমেছিল সেই সময়। এই আসনগুলির ভোটাররা ভোটদানের সুযোগটুকু পর্যন্ত পাননি। গোটা ঘটনার জল গড়িয়েছিল সুপ্রিম কোর্টেও। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এতগুলো আসন দেখে সর্বোচ্চ আদালতের মন্তব্য ছিল, তারা “স্তম্ভিত”।

২০২১ বিধানসভা নির্বাচন ও তার পরে আট দফার নির্বাচনের সময় রাজ্যে রক্তগঙ্গা বইছিল। প্রাণ হারান ৫৮-রও বেশি জন। রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগও ছিল কয়েকশো। পরিসংখ্যান বলছে, সেই নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) কমিটির কাছে ১৫,০০০-এরও বেশি আক্রান্তের প্রায় ১,৯৭৯টি অভিযোগ জমা পড়েছিল।

২ মে ২০২১ থেকে ২০ জুন ২০২১-এর মধ্যে পুলিশের কাছে খুন, ধর্ষণ সহ একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে। সেই তালিকায় ছিল ২৯টি খুন, ১২টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন, এবং লুটপাট ও ৯৪০টি অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা। বিধানসভা ভোটের পর ২০২৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় এই চিত্রটা আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভোটের দিনই মৃত্যু হয় ১৫ জনের। আর ভোট-সংক্রান্ত হিংসায় সবমিলিয়ে প্রায় ৫০ জন প্রাণ হারান।

সেই সময় রাজ্যজুড়ে হিংসা ও ব্যালট বাক্সে কারচুপির কারণে ৬৯৬টি বুথে ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য নির্বাচন কমিশন। মামলার পর মামলা দায়ের হয় কলকাতা হাইকোর্টে। এরপর ২০২৫ সালে কাকদ্বীপে ভোটার তালিকা নিয়ে বড়সড় অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এক সিস্টেম ম্যানেজারকে সাসপেন্ড করে নির্বাচন কমিশন।

অভিযোগ উঠেছিল, ওই ব্যক্তি অনুমতি ছাড়াই কাকদ্বীপের এইআরও-র লগইনে নিজের মোবাইল নম্বর যুক্ত করে সেই নম্বরে আসা ওটিপি ব্যবহার করে ফর্ম ৬, ৭ ও ৮-এর আবেদনগুলির নিষ্পত্তি করেন। জানিয়ে রাখি, এই ফর্মগুলির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নতুন নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া এবং বিদ্যমান থাকা তথ্য সংশোধন করার প্রক্রিয়া হয়।

Mamata Banerjee

২০২৫ সালের অগাস্টে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন বারুইপুর পূর্ব ও ময়নার চারজন ডব্লিউবিসিএস আধিকারিককে সাসপেন্ড করে। ভোটার তালিকায় অনিয়ম করে নাম তোলা এবং অননুমোদিত ব্যক্তিদের সঙ্গে আধিকারিকদের লগইন সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। আর সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, যে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়ালের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই অনিয়ম প্রকাশ্যে আসে।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, যে আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে অনিয়মের বিষয়টি সামনে এসেছিল, তাঁকেই রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করার যৌক্তিকতা কোথায়? এদিকে সেই সময় তৃণমূল সরকার আধিকারিকদের সাসপেন্ড করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর দায়ের করেনি। এই নিয়েও হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছিল। একইভাবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারীতে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন নির্বাচন কমিশন আরও সাতজন এইআরও-কে সাসপেন্ড করে। একইসাথে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের এসআইআর-এর দায়িত্ব থেকে সরিয়েও দেয়।

mamata banerjee(21)

তথ্য বলছে, তৃণমূল কংগ্রেসের বিগত পনেরো বছর ধরে যে ভোটার তালিকা পারচালনা করেছে, তার থেকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছে ২৪.১৭ লক্ষ মৃত ভোটারের নাম। স্থায়ীভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন এমন ভোটারের সংখ্যা ১৯.৮৮ লক্ষ।
১২.২০ লক্ষ অনুপস্থিত ভোটার। একইসাথে ১.৩৮ লক্ষ ডুপ্লিকেট নাম।

এসআইআরই দেখিয়েছে বাংলার ভোটার তালিকার বিচিত্র সব দিক। যেখানে চিহ্নিত হয়েছে ১১.৯৫ লক্ষ ক্ষেত্র, যেখানে বাবা-মায়ের বয়স সন্তানের চেয়ে ১৫ বছরেরও কম বেশি নথিভুক্ত, ৮.৭৭ লক্ষ ক্ষেত্র, যেখানে এই ব্যবধান ৫০ বছরেরও বেশি, এবং ৩.২৯ লক্ষ ক্ষেত্র, যেখানে দাদু-ঠাকুমার বয়স ভোটারের চেয়ে ৪০ বছরেরও কম বেশি। যেই সমস্ত বিষয় সামনে এসেছে এসআইআর প্রক্রিয়া হওয়ার পরই।

mahua moitra

প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে ‘ভোট চোর’ বলে উল্লেখ করা আসলে তৃণমূলের নিজের ভোট চুরি ফাঁস করার জ্বালা থেকে করা হচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে। যার তত্ত্বাবধানে বিগত দুই দশকে প্রথম অবাধ নির্বাচন এই বাংলার বুকে, তাঁকেই কাঠগড়ায় তুলছে মমতা তৃণমূল। ২০২৬ ছিল এমন নির্বাচন যেখানে, ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের কোথাও কোনও মৃত্যু হয়নি, সন্ত্রাসের কোনও সামনে আসেনি। উৎসবের মতো নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগে অংশগ্রহণ করেছেন ভোটাররা।

এই গেল তৃণমূল ও মনোজ আগরওয়াল প্রসঙ্গ। এবারে যিনি ‘ভোট চোর’ বলে গলা ফাটাচ্ছেন তিনি নিজে যেসকল বিতর্কে জড়িয়েছেন তাও এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল।

নিজের লোকসভা লগইন ব্যবসায়ীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো বিস্ফোরক অভিযোগে মহুয়া মৈত্রকে ২০২৩ সালে বহিষ্কার করা হয়। লোকসভা ৮ ডিসেম্বর ২০২৩ তাঁকে বহিষ্কার করে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশ্নের বিনিময়ে টাকা নেওয়ার মামলাও বর্তমানে বিচারাধীন। ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা খারিজ করেছেন, আর মা কালীকে নিয়ে মন্তব্যের সময় তাঁর এই দল তৃণমূলই তাঁর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেছিল।

আরও পড়ুন: DA বৃদ্ধির জন্য এবারে অনেক বেশি অপেক্ষা? সরকারি কর্মীদের জন্য ‘খারাপ খবর’

যিনি নিজেই সময়ে অসময়ে নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন, সেখানে অন্যকে ‘চোর’ বলার নৈতিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করছে। কারণ অতীতে “কুকুর চোর” বলে অভিযোগ উঠেছিল এই মহুয়াকে ঘিরেই।