বাংলাহান্ট ডেস্ক: প্রায় এক শতাব্দীর অপেক্ষার অবসান। অবশেষে স্থায়ী হাইকোর্ট বেঞ্চ পেল কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখ (Ladakh)। রবিবার লেহ শহরে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৫০০ মিটার উচ্চতায় এই বেঞ্চের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India) সূর্য কান্ত (Surya Kant)। দেশের কোনও হাইকোর্টের এত উঁচুতে অবস্থিত বেঞ্চ হিসেবে এটি নতুন নজির তৈরি করল। তবে প্রধান বিচারপতির বক্তব্যে স্পষ্ট, এই উদ্যোগের গুরুত্ব শুধু উচ্চতার নিরিখে নয়, বরং দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষের কাছে বিচারব্যবস্থাকে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে। তাঁর কথায়, আদালত কতটা উঁচুতে বসেছে, তার চেয়ে বড় কথা হল, সাধারণ মানুষের কতটা কাছে পৌঁছতে পারছে।
লে-তে লাদাখ হাইকোর্ট বেঞ্চের উদ্বোধন করলেন প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of India)
লাদাখের ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই আদালতে পৌঁছনো স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকা, দুর্গম পথ এবং তীব্র শীতের সঙ্গে লড়াই করে অনেককে আইনি পরিষেবা পেতে দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়। ফলে বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক খরচের পাশাপাশি সময় ও শারীরিক কষ্টও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের জন্য একটি অভিন্ন হাইকোর্ট রয়েছে, যার প্রধান বেঞ্চ জম্মু ও শ্রীনগরে। লেহ-তে নতুন বেঞ্চ চালু হওয়ায় হাইকোর্টের বিচারাধীন মামলা বা উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এমন বিষয়ে লাদাখের বাসিন্দাদের আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বাইরে যেতে হবে না। ১৯২৮ সালের ২৬ মার্চ তৎকালীন প্রধান বিচারপতি লালা কানওয়ার সেন-সহ তিন বিচারপতিকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জম্মু ও কাশ্মীর হাইকোর্ট। সেই সূচনার প্রায় ৯৮ বছর পর লাদাখে এই নতুন ব্যবস্থা চালু হল (Chief Justice of India)।
২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর জম্মু ও কাশ্মীরের পুনর্গঠনের পর লাদাখ পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পায়। একই সঙ্গে তৎকালীন রাজ্যটি ভাগ হয়ে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ—দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়। এরপরও দুই অঞ্চলের জন্য অভিন্ন হাইকোর্টের ব্যবস্থা বজায় থাকে। হাইকোর্টের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘হাইকোর্ট অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর অ্যান্ড লাদাখ’। অনুষ্ঠানে সেই ইতিহাস তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, আদালতের লেটারহেডে কোনও অঞ্চলের নাম থাকা আর সেখানকার মানুষের কাছে বাস্তবে বিচারব্যবস্থা পৌঁছে যাওয়া এক বিষয় নয়। এত দিন লাদাখের মানুষকে দুর্গম গিরিপথ পেরিয়ে আদালতে পৌঁছতে হত। এবার হাইকোর্টই যেন সেই দূরত্ব অতিক্রম করে তাঁদের কাছে পৌঁছে গেল। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি পুষ্পেন্দ্র কুমার ভাটি, লাদাখের উপরাজ্যপাল ভি কে সাক্সেনা এবং ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরমানি।
তবে শুধু লেহ-তে বেঞ্চ চালু করলেই প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি মানুষের কাছে বিচার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর মতে, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আইনি সহায়তা পরিষেবাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে, যাতে দূরবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও সহজে আইনি পরামর্শ ও পরিষেবা পান। তাঁর বক্তব্য, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া আদালতের চার দেওয়ালের মধ্যে শুরু হয় না; বরং বিচারপ্রার্থীর বাড়ির দরজা থেকেই তার সূচনা হওয়া উচিত। অর্থাৎ, আদালত প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে আইনি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। লাদাখের মতো দুর্গম অঞ্চলে প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা এই লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

আরও পড়ুন: ‘উড়ন্ত গাড়ি’ এনে তাক লাগালেন মাস্ক! টেসলা রোডস্টার কিনতে করতে হবে কত খরচ?
এ দিনের অনুষ্ঠানে লাদাখের আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি জানান, লেহ বেঞ্চে পর্যাপ্ত ভিডিও কনফারেন্সিং পরিকাঠামো গড়ে উঠলে সুপ্রিম কোর্টে লাদাখ থেকে আসা মামলাগুলির শুনানির জন্য সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিন বরাদ্দ করা হবে। সেই দিন ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে দিনভর মামলাগুলির শুনানি চলবে। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টে কোনও মামলার শুনানির জন্য লাদাখ থেকে দিল্লি যাওয়ার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রেই কমতে পারে। সব মিলিয়ে, লেহ-তে হাইকোর্ট বেঞ্চ চালু হওয়া শুধু বিচারব্যবস্থার প্রশাসনিক সম্প্রসারণ নয়, বরং ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ন্যায়বিচার পেতে সমস্যায় পড়া মানুষের কাছে আদালতকে আরও সহজলভ্য করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ (Chief Justice of India)।














