বাংলাহান্ট ডেস্ক: গত বছরের তীব্র গণআন্দোলনের পর নেপালের (Nepal) রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় নতুন নেতৃত্বকে ক্ষমতায় এনেছিলেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দেশের তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই সেই আশার জায়গায় আবারও জন্ম নিয়েছে ক্ষোভ। প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের (Balendra Shah) সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে পথে নেমেছে নেপালের জেন-জি আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থকেরা। তাঁদের অভিযোগ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন এখনও দেখা যায়নি। ফলে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ (Kathmanudu) বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদের নতুন ঢেউ দেখা দিয়েছে।
নেপাল (Nepal) নতুন প্রধানমন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে গায়ে আগুন দিলেন ৩ যুবক
পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন গত তিন দিনের মধ্যে তিনজন যুবক প্রকাশ্যে গায়ে পেট্রল ঢেলে আত্মাহুতির চেষ্টা করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মধ্যে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তৃতীয় যুবক এখনও গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এই ঘটনাগুলি নেপালজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা হতাশাই তরুণদের এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে এবং পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছে প্রশাসন। আত্মাহুতির এই ঘটনাগুলি নেপালের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
জেন-জি নেপাল সংগঠনের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ ক্ষমতায় আসার আগে যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তার অনেকটাই অপূর্ণ রয়ে গেছে। সংগঠনের দাবি, যুবকদের কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। পাশাপাশি সরকারের বিরুদ্ধে জনবিরোধী ও স্বৈরাচারী মনোভাবের অভিযোগও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল নেপালি কংগ্রেসও আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের বক্তব্য, এই আত্মাহুতির ঘটনাগুলি কেবল ব্যক্তিগত হতাশার ফল নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। ফলে সরকারকে দ্রুত পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আত্মাহুতির ঘটনা নেপালের রাজনীতিতে নতুন নয়। ২০২৩ সালে প্রেম আচার্য নামে এক যুবক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একইভাবে আত্মাহুতি দেন। সেই সময় তৎকালীন কাঠমান্ডুর মেয়র বলেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন এবং দুর্নীতি, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। সেই আন্দোলনের জেরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকার চাপে পড়ে এবং পরবর্তী নির্বাচনে বলেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি নতুন নেপাল গড়ার আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

আরও পড়ুন: ইলন মাস্ককে কড়া টক্কর! SpaceX-এর সমমানের রকেট ইঞ্জিন তৈরি করে বিশ্বকে চমকে দিল ভারতের কোম্পানি
কিন্তু এক বছর না পেরোতেই সেই নেতৃত্বই এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যুবসমাজের হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। যদিও সরকার এখনও এই অভিযোগগুলির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেয়নি, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত সংলাপ শুরু করা, যুবসমাজের উদ্বেগের সমাধান করা এবং কার্যকর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, গত বছরের মতো নতুন করে গণআন্দোলনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না (Nepal)।













