বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতের (India) পরমাণু প্রতিরক্ষা নীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সিপরি (SIPRI)-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারত ১২টি পরমাণু ওয়ারহেডকে ‘অপারেশনাল ডেপ্লয়মেন্ট’ বা সক্রিয় মোতায়েনের আওতায় এনেছে। এতদিন পর্যন্ত ভারতের ঘোষিত নীতি ছিল শান্তিকালীন অবস্থায় পরমাণু ওয়ারহেড এবং সেগুলি বহনকারী ক্ষেপণাস্ত্রকে আলাদা স্থানে সংরক্ষণ করা। কিন্তু নতুন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, এখন সেই নীতিতে আংশিক পরিবর্তন এনে কিছু পরমাণু অস্ত্রকে দ্রুত ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় রাখা হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রথমবার ১২ টি ‘রেডি টু ওয়ার’ পারমাণবিক অস্ত্র সক্রিয় মোতায়েনের আওতায় আনল ভারত (India)
সিপরি-র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের (India) এই ১২টি পরমাণু ওয়ারহেড বর্তমানে এমন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত যেখানে সেগুলি সংশ্লিষ্ট ডেলিভারি সিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, প্রয়োজনে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেগুলি ব্যবহার করা সম্ভব। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই অস্ত্রগুলি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি অথবা পরমাণু সক্ষম সাবমেরিনে মোতায়েন থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের মোতায়েন কোনও দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও কার্যকর করে তোলে। কারণ, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ওয়ারহেড ও ক্ষেপণাস্ত্র একত্রিত করার জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয় না। ফলে সম্ভাব্য হুমকির মোকাবিলায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন:টেট নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটুক, মিছিল থেকে দুই সরকারের কাছে বড় দাবি একাধিক শিক্ষক সংগঠনের
একই সঙ্গে সিপরি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ভারতের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা বেড়ে ১৯০-এ পৌঁছেছে। এক বছর আগে এই সংখ্যা ছিল ১৮০। অর্থাৎ, গত এক বছরে ভারত তার পরমাণু অস্ত্র ভাণ্ডারে আরও ১০টি ওয়ারহেড যুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই আধুনিকীকরণ কর্মসূচির পেছনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে চীনের দ্রুত সামরিক সম্প্রসারণ এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লি তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিনভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নজরদারি অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও জোরদার করা হয়েছে।
তবে ভারতের পারমাণবিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। সিপরি-র রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারত তার ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা ‘প্রথমে পরমাণু হামলা না করার’ নীতিতে অনড় রয়েছে। অর্থাৎ, ভারত নিজে থেকে কোনও দেশের বিরুদ্ধে প্রথম পরমাণু আঘাত হানবে না। কিন্তু যদি কোনও শত্রুদেশ ভারতের বিরুদ্ধে পরমাণু হামলা চালায়, তাহলে দ্রুত এবং বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রাখাই এই নতুন কৌশলের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্রিয় মোতায়েনের মাধ্যমে ভারতের প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন: আরও বাড়ল অভিষেকের বিপদ! হাজিরার নির্দেশ দিয়ে সমন পাঠাল ত্রিপুরার আদালত
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ ভারতের (India) সামরিক নীতিতে আক্রমণাত্মক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং প্রতিরোধমূলক কৌশলকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে, যেখানে পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলির মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে ভারত তার নিরাপত্তা স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েই এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লি বিশ্বকে বার্তা দিতে চেয়েছে যে, শান্তিপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখলেও দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি তার রয়েছে। ফলে ভারতের এই নতুন পারমাণবিক মোতায়েন নীতি আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।













