বাংলাহান্ট ডেস্ক: ২০২৫ সালের ১২ জুন আমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার (Air India Crash) ড্রিমলাইনার বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু সময়ের কাঁটা এক বছর এগোলেও সেই ভয়াবহ দিনের ক্ষত এখনও শুকোয়নি মৃতদের পরিবার ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জীবনে। সরকারি ক্ষতিপূরণ, আর্থিক সহায়তা কিংবা চিকিৎসা— কোনও কিছুই তাঁদের জীবনের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি। ২৬০ জনের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু কয়েকটি জীবনই শেষ করেনি, বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন এবং মানসিক শান্তিও কেড়ে নিয়েছে।
আহমেদাবাদের ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার (Air India Chrash) এক বছর পরেও আতঙ্কে রফিক-মুক্তিরা:
দুর্ঘটনায় নিহত ২৫ বছরের ফাইজান আরব ছিলেন ব্রিটেনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ়ের ছাত্র। ছুটি কাটাতে দিউয়ে পরিবারের কাছে এসেছিলেন তিনি। ১২ জুন লন্ডনে ফেরার পথে সেই অভিশপ্ত বিমানে উঠেছিলেন। তাঁর বাবা রফিক আরব আজও ভুলতে পারেননি ছেলের শেষ বার্তাটি। বিমানে ওঠার পর ফাইজ়ান লিখেছিলেন, “পাপা, আই হ্যাভ বোর্ডেড দ্য ফ্লাইট অ্যান্ড আই অ্যাম গোয়িং।” সেই বার্তাই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি। রফিক জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি আর কখনও বিমানবন্দরে যাননি। এমনকি জীবনের বাকি সময়েও আর বিমানে না ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্লেনের শব্দ শুনলেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে পুড়ে যাওয়া দেহের বিভীষিকা। শোকস্তব্ধ ফাইজ়ানের মা, আর দুই ছোট ভাইয়ের মুখ থেকেও যেন চিরতরে হারিয়ে গেছে হাসি (Air India Crash)।
এই দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু যাত্রীদের পরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মেঘানিনগরের মেডিক্যাল কলেজ হস্টেলের কাছে মোটরবাইকে বাড়ি ফিরছিলেন ২৮ বছরের অজয় পারমার। আচমকাই ভেঙে পড়া বিমানের আগুনে গুরুতরভাবে ঝলসে যান তিনি। দুই হাত ও দুই পায়ে মারাত্মক আঘাত লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও আগের জীবনে আর ফিরতে পারেননি। পেশায় গার্ডেনার অজয়কে চিকিৎসকেরা রোদে কাজ করতে নিষেধ করেন, ফলে চাকরিও হারান তিনি। মাত্র এক মাস আগে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। দুর্ঘটনার পর শারীরিক পরিবর্তন ও আর্থিক অনটনের মধ্যে তাঁকে ছেড়ে চলে যান তাঁর স্ত্রী। এক মুহূর্তে জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন অজয়।
সেই বিমানে ক্রু ও যাত্রী মিলিয়ে মোট ২৪২ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একমাত্র জীবিত উদ্ধার হন বিশ্বাস কুমার রমেশ। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই ব্রিটিশ নাগরিক এখনও মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। দুর্ঘটনার পর তাঁকেই নিজের ভাইয়ের দেহ শনাক্ত করতে হয়েছিল। বর্তমানে তাঁর মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে। বিমানটি হস্টেলের উপর ভেঙে পড়ার ফলে আরও ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সরকার এবং এয়ার ইন্ডিয়া নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বটে, কিন্তু যে মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয় তাঁদের জীবনে নেমে এসেছে, তা কোনও অর্থমূল্যে পূরণ করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: পাক সেনার বর্বরতায় স্তম্ভিত গোটা বিশ্ব! PoK-তে গুলি করে হত্যা ১৬ জন প্রতিবাদীকে
সুরাটের বাসিন্দা মুক্তি ভানসাদিয়ার জীবনও সেই দুর্ঘটনার পর সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তাঁর বাবা অর্জুন ভানসাদিয়া এবং মা দিব্যা ভানসাদিয়া জীবনে প্রথমবার বিমানে চড়ে লন্ডনে বড় মেয়ের কাছে যাচ্ছিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে বিমানযাত্রা ছিল এক বিশেষ স্বপ্নপূরণ। মুক্তি স্মরণ করেন, বিমানযাত্রা নিয়ে তাঁর বাবা-মা কতটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন। তাঁদের জন্য বিশেষভাবে আমেদাবাদ-লন্ডন সরাসরি ফ্লাইটের টিকিট কেটেছিলেন তিনি। বিমানবন্দরে বিদায়ের সময় বাবার পিঠে স্নেহের সেই চাপড় আজও অনুভব করেন মুক্তি। দুর্ঘটনার পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন, দীর্ঘদিন কাউন্সেলিং করাতে হয়েছে তাঁকে। এক বছর পরও স্মৃতির ভারে ভেঙে পড়েন তিনি। তাঁর কথায়, “মাঝে মাঝেই বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে ওঠে কান্না।” ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনার এক বছর পরেও সেই কালো দিনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শত শত মানুষ (Air India Crash)।













