আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের মাস্টারস্ট্রোক! খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোদীর পরিবর্তে ইরানে যাচ্ছেন কারা?

Published on:

Published on:

India is sending a special delegation to Iran instead of Modi for Khamenei's funeral.
Follow

বাংলাহান্ট ডেস্ক: প্রায় ৪ মাসেরও বেশি সময় পর অবশেষে ইরানের প্রাক্তন সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়েছে আগামী ৪ জুলাই। তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য ইরানের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের (India) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে। তবে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করছেন না প্রধানমন্ত্রী। পরিবর্তে ভারত সরকারের তরফ থেকে দুই সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সেখানের পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই দলে রয়েছেন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্গারিটা এবং বিহারের রাজ্যপাল লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতা হাসনাইন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, কেন নিজে না গিয়ে প্রতিনিধি পাঠানোর পথ বেছে নিলেন মোদি? বিভিন্ন কূটনৈতিক মহলের মতে, এর নেপথ্যে রয়েছে নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে মোদীর পরিবর্তে ইরানে বিশেষ প্রতিনিধি দল পাঠাচ্ছে ভারত (India):

খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে যোগ না দেওয়া পিছনে সবচেয়ে প্রথমেই যে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি মনে করা হচ্ছে সেটি হল নিরাপত্তা। বর্তমান সময়ে ইরান ও আমেরিকার এখনও অব্যাহত রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের ইরান সফর অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। এর আগেও ২০২৪ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের (India) হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতীন গড়করি। সেই একই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হামাসের তৎকালীন প্রধান ইসমাইল হানিয়াও। কিন্তু অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেহরানের একটি হোটেলে নিহত হন হানিয়া। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ইরান, ইজরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’-কে দায়ী করেছিল, যদিও ইজরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে সেই অভিযোগ স্বীকার করেনি। আর সেই ঘটনাই ইরানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের আরও উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রী মোদির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের এই মূহুর্তে ইরান সফর নিয়ে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করাই প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: বজ্রপাতের জেরে হলদিয়ায় শিল্পাঞ্চলে বড় দুর্ঘটনা, পাইপলাইনে আগুনে আহত বহু কর্মী

নিরাপত্তার পাশপাশি আরও একটি গুরত্বপূর্ণ কারণ হল ভারতের বহুমুখী কূটনৈতিক সমীকরণ। একদিকে ইরানের সঙ্গে যেমন ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে আবার আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গেও একইভাবে নয়াদিল্লির কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমশ আরও গভীর হয়েছে। আর এই মুহুর্তে ওই দুই দেশই আবার ইরানের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে এমন সংবেদনশীল সময়ে প্রধানমন্ত্রী যদি ব্যক্তিগতভাবে তেহরান সফর করতেন, তাহলে আন্তর্জাতিক মহলে তার ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা যেতে পারে। তাই সেই সম্ভাবনা এড়াতেই ভারত সরকার এমন একটি পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে ইরানের প্রতি সম্মানও জানানো হচ্ছে, আবার অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের কাছেও নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থানের বার্তা পৌঁছে দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন।

ইরানে না যাওয়ার অন্যতম আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় দেশগুলির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং কাতারের মতো দেশগুলি। এছাড়াও লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ওই দেশগুলিতে কর্মরত, যাঁদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতেও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এই দেশগুলির সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিন ধরেই নানা কারণে টানাপোড়েন চলে আসছে। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যদি সরাসরি ইরান সফরে যেতেন, তাহলে সেই পদক্ষেপ উপসাগরীয় দেশগুলির কাছে কী বার্তা দিত, তা নিয়েও নয়াদিল্লি সতর্ক ছিল। তাই সবদিক বিচার বিবেচনা করেই প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্তকে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

India is sending a special delegation to Iran instead of Modi for Khamenei's funeral.

আরও পড়ুন: মমতার সঙ্গ ছেড়ে বিদ্রোহী আরও ৩? ঋতব্রত শিবিরের ৪ বিধায়ক নিয়ে পাল্টা দাবি কালীঘাটের

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও আমেরিকার যৌথ সামরিক অভিযানে আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হন বলে ইরান জানিয়েছে। তবে যুদ্ধপরিস্থিতি এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে এতদিন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে আগামী ৪ জুলাই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ধর্মীয় আচার শুরু হবে এবং জানা যাচ্ছে ৯ জুলাই ইরানের মাশহাদ শহরে তাঁকে সমাহিত করা হবে। মাশহাদই ছিল খামেনেইয়ের জন্মস্থান। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থাকতে না পারলেও ভারতের (India) প্রতিনিধি দল উপস্থিত থেকে দেশের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানাবে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারত এখন আবেগের চেয়ে বাস্তবতা এবং কৌশলগত ভারসাম্যকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।