বাংলা হান্ট ডেস্ক: বর্তমানে বারংবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে টাটা গ্রুপ। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে টাটা গ্রুপ বর্তমানে বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান টাটা সন্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন টাটা ট্রাস্টসের প্রধান নোয়েল টাটা (Noel Tata)। সম্প্রতি রিপাবলিক টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোয়েল টাটা স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি টাটা সন্সের (Tata Sons) পাবলিক লিস্টিং অর্থাৎ IPO-র ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করেন, স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হলে টাটা গ্রুপের (Tata Group) ১৫০ বছরের পুরনো কাঠামোটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। যা এতদিন পর্যন্ত সংস্থাটিকে টিকিয়ে রেখেছে। এটি কেবল একটি সংস্থার শেয়ার বাজারে প্রবেশের বিষয় নয়, বরং এটি সেই বিশ্বাস এবং কর্মপদ্ধতিকে বাঁচানোর লড়াই, যার জন্য টাটা গ্রুপ বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
নোয়েল টাটা কেন শেয়ার বাজারে টাটা সন্সের (Tata Sons) লিস্টিংয়ের বিরোধিতা করছেন?
সঙ্কটের সময়ে টাটা সন্স ঢাল হিসেবে কাজ করে: জানিয়ে রাখি যে, টাটা সন্স মূলত একটি হোল্ডিং কোম্পানি। এর প্রধান কাজ হল গ্রুপের অন্য সব সংস্থাকে দিকনির্দেশ দেওয়া। নোয়েল টাটা ব্যাখ্যা করেছেন, বিগত ১৫০ বছর ধরে টাটা সন্স তার অধীনস্থ সংস্থাগুলির জন্য একটি শক্তিশালী আর্থিক ঢাল হিসাবে কাজ করে আসছে। যখনই টাটা গ্রুপের কোনও সংস্থা কঠিন সময়ের সম্মুখীন হয়, টাটা সন্স সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য নিজস্ব ফান্ড বিনিয়োগ করে। এই অতুলনীয় আস্থার কারণে ব্যাঙ্ক, ঋণদানকারী সংস্থা, শেয়ারহোল্ডার এবং সরবরাহকারীরা আত্মবিশ্বাসী থাকে। তারা জানে যে সঙ্কটের সময়ে টাটা সন্স ঢাল হয়ে তাদের পাশে আছে। এমতাবস্থায়, সংস্থাটি যদি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়, তবে এই সবকিছু চিরতরে বদলে যাবে। নোয়েল টাটার সবচেয়ে বড় ভয় হল, একবার সাধারণ শেয়ার হোল্ডাররা এসে গেলে লোকসানে থাকা বা সঙ্কটে থাকা কোনও সংস্থায় বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বহিরাগত বিনিয়োগকারীরা, যাঁরা কেবল নিজেদের আর্থিক লাভের কথাই ভাবেন, তারা হয়তো কোনও ব্যর্থ সংস্থায় নতুন বিনিয়োগের অনুমতিই দেবেন না। এটি গ্রুপের ভিত্তিকে যথেষ্ট দুর্বল করে দিতে পারে।

বোর্ড মিটিং চলাকালীন বড় সংঘাত: উল্লেখ্য যে, গত ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ড মিটিংয়ের পর এই বিতর্কটি প্রকাশ্যে আসে। যেখানে চেয়ারম্যান নটরাজন চন্দ্রশেখরন আরও ৫ বছরের জন্য পুনর্নির্বাচিত হন। এর পাশাপাশি, বোর্ড সংস্থাটিকে লিস্টিংয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বড় সিদ্ধান্তও নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে নোয়েল টাটা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। অর্থাৎ তিনি ভোটে পরাজিত হন। সামগ্রিকভাবে এই বিষয়টি টাটা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ চলমান দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। একদিকে রয়েছে এমন একটি গোষ্ঠী, যারা কোম্পানিটিকে শেয়ার বাজারে লিস্টিং করে এর আর্থিক রূপান্তর ঘটাতে চায়। অন্যদিকে, নোয়েল টাটার মতো এমন মানুষও আছেন যাঁরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, বাইরের বিনিয়োগকারীদের প্রবেশ গ্রুপটির মূল আদর্শকে ধ্বংস করে দেবে। যা বরাবরই তার ব্যবসাগুলিকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।
আরও পড়ুন: কৃষকদের সুবিধার্থে মোদী সরকারের দুর্দান্ত উপহার! গম-সহ ৬ টি রবি শস্যের জন্য হল বড় ঘোষণা
লিস্টিং বিলম্বিত করার নতুন কৌশল: এদিকে, লিস্টিংয়ের এই বিপুল চাপ এড়াতে টাটা ট্রাস্টস একটি নতুন কৌশল তৈরি করেছে। টাটা ট্রাস্টস টাটা সন্সের প্রায় ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক। ট্রাস্টস আনুষ্ঠানিকভাবে টাটা সন্সকে তাদের দু’টি আনলিস্টেড সহযোগী সংস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এদের মধ্যে টাটা কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স এবং টাটা ইলেকট্রনিক্স সিস্টেমস সলিউশনস প্রাইভেট লিমিটেড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নোয়েল টাটা জানিয়েছেন যে, এই প্রস্তাবিত সংযুক্তিকরণ টাটা সন্সের আর্থিক কাঠামোকে সম্পূর্ণরূপে উন্নত করবে। এর ফলে সংস্থাটির নিজস্ব অপারেটিং আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হল সংস্থাটিকে কঠোর নন-ব্যাঙ্কিং ফাইনান্সিয়াল কোম্পানি তথা NBFC-র সেই কড়া নিয়ম থেকে মুক্ত করা, যার জন্য স্টক মার্কেটে লিস্টিং হওয়া আবশ্যক। নোয়েল টাটার মতে, ভারতে এমন অনেক হোল্ডিং কোম্পানি রয়েছে যারা অপারেটিং ও আর্থিক কার্যক্রমকে একত্র করে। এই পদক্ষেপগুলি পুরোনো মালিকানা মডেল বজায় রেখে বিনিয়োগ আয়ের ওপর নির্ভরতা কমাবে।
আরও পড়ুন: আগরকরের পরে টিম ইন্ডিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন চিফ সিলেক্টর হলেন প্রজ্ঞান ওঝা! কী পরিকল্পনা BCCI-র?
জনহিতকর কার্যক্রমের ওপর হুমকির আশঙ্কা: জানিয়ে রাখি যে, টাটা গ্রুপ লবণ থেকে শুরু করে SUV পর্যন্ত সবকিছু তৈরি করে। তারা শুধু তাদের বিশাল ব্যবসার জন্যই নয়, বরং, জনহিতকর কাজের জন্যও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। নোয়েল টাটা এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উপস্থাপিত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, লিস্টিংয়ের পর, সংস্থটির ওপর ধারাবাহিকভাবে উন্নত আর্থিক কর্মক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য প্রচণ্ড চাপ থাকবে। বহিরাগত শেয়ার হোল্ডাররা চান যে সংস্থাটি কেবল মুনাফা সর্বাধিক করুক। মুনাফার এই উন্মত্ত প্রতিযোগিতায় টাটা সন্সের কয়েক দশক ধরে চলে আসা জনহিতকর দৃষ্টিভঙ্গিটি হয়ত পেছনে পড়ে যেতে পারে। যেহেতু ট্রাস্টস সরাসরি কোম্পানির ৬৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক, তাই এই লিস্টিং ট্রাস্টের সামাজিক কাজকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। নোয়েল টাটা আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করবে। তিনি জানিয়েছেন, একটি রাস্তা খুঁজে বের করার জন্য তিনি RBI-এর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করবেন। পুরো বিষয়টি এখন নির্ভর করছে টাটা সন্স তার ১৫০ বছরের পুরনো ব্যবসায়িক মডেলটি বজায় রাখবে, নাকি লিস্টিংয়ের জন্য নতুন কোনও পথে পা বাড়াবে তার ওপর। এই প্রস্তাবটি এখনও টাটা সন্সের বোর্ড এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।













