বাংলাহান্ট ডেস্ক: রাশিয়ার (Russia) সঙ্গে ভারতের (India) সম্পর্ক নিয়ে পশ্চিমী বিশ্বের একাংশের প্রশ্ন ও সমালোচনার মধ্যেই নয়াদিল্লির অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট করলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর (S. Jaishankar)। রবিবার নয়াদিল্লিতে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও দেশ শুধু অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় না। বরং নিজের অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই বন্ধুত্ব ও অংশীদারিত্বকে বিচার করে। সেই প্রসঙ্গেই রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরে জয়শংকর বলেন, “মানুষ ভালো ইতিহাস যেমন ভোলে না, খারাপ ইতিহাসও ভোলে না।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, মস্কোর সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্কের পিছনে শুধু আজকের কূটনীতি নয়, রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাও।
রাশিয়া (Russia) ও ভারতের বন্ধুত্ব নিয়ে স্পষ্ট বার্তা জয়শঙ্করের
রাশিয়ার (Russia) সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের শিকড় কতটা গভীরে, তা বোঝাতে ১৯৫০-এর দশক থেকে দুই দেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গ টানেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এমন একাধিক সময়ে যখন ভারতের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের পাশে ছিল। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠে আসে তাঁর কথায়। সেই সময় ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সামরিক সরকারের দিকে ঝুঁকে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌবহর পাঠালেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বজায় ছিল। জয়শংকরের বক্তব্য, সেই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাই আজও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে প্রভাবিত করে।
আরও পড়ুন:ফ্লাইদুবাই কাণ্ডে ‘উল্লাস’ আল-কায়দা-সমর্থকদের! ঘটনার প্রশংসা করে বড় হুমকি আল-কায়দার
তবে সময়ের সঙ্গে ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের চরিত্রও বদলেছে বলে জানান বিদেশমন্ত্রী। তাঁর কথায়, একসময় দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রে মূলত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা থাকলেও এখন তার পরিধি অনেকটাই বেড়েছে। সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি পরমাণু ও মহাকাশ ক্ষেত্র, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং জ্বালানি—একাধিক ক্ষেত্রেই দুই দেশ পরস্পরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ফলে ইউরোপ বা আমেরিকা যে দৃষ্টিকোণ থেকে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ককে বিচার করছে, ভারত একইভাবে তা দেখবে না বলেই ইঙ্গিত দিয়েছেন জয়শংকর। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, প্রতিটি দেশ নিজের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিদেশনীতি তৈরি করে এবং ভারতের ক্ষেত্রেও সেই নীতিই প্রযোজ্য।
এরই মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়া থেকে ভারতের অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে পশ্চিমী দেশগুলির সমালোচনাও তীব্র হয়েছে। নয়াদিল্লি অবশ্য বারবার বলে এসেছে, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে দেশের প্রয়োজন, দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রুশ তেল কেনার প্রসঙ্গে জয়শংকর আগেও দাবি করেছিলেন, ২০২২ সালে বিশ্ববাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য ওয়াশিংটনই ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইউরোপের দেশগুলি মধ্যপ্রাচ্যের তেলের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ায় ভারতের জন্য রুশ তেল তখন গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছিল। সাম্প্রতিক সময়েও তিনি জানিয়েছেন, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতের জ্বালানি মিশ্রণের অংশ হিসেবেই থাকবে।

আরও পড়ুন: BSF-র গুলিতে ২ পাকিস্তানির মৃত্যু, তেতে উঠল ইসলামাবাদ! ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে তলব পাকিস্তানের
একইসঙ্গে রাশিয়ার (Russia) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই ইউক্রেন যুদ্ধকে সমর্থন করা নয়—ভারতের অবস্থানেও সেই বার্তাই ফের উঠে এসেছে। জয়শংকর স্পষ্ট করেছেন, নয়াদিল্লি যুদ্ধের অবসান চায় এবং তার জন্য আলোচনার পথেই সমাধান খোঁজার পক্ষে। ভারত একইসঙ্গে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টায় যুক্ত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ একদিকে দীর্ঘদিনের মস্কো-নয়াদিল্লি সম্পর্ককে অক্ষুণ্ণ রাখা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে আলোচনার পক্ষে থাকা—এই তিনটি দিক মিলিয়েই ভারতের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান এগোচ্ছে। পশ্চিমী চাপের মধ্যেও জয়শংকরের বক্তব্যে সেই স্বাধীন বিদেশনীতির ছবিই আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে।













