বাংলাহান্ট ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের জন্য ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানের ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নথি আরটিআই (RTI)-এর মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না বলে জানালো দিল্লি হাই কোর্ট (Delhi High Court)। জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর জীবন ও শারীরিক সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের (CIC) আগের নির্দেশ খারিজ করে দিল দিল্লি হাই কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় গোপন করলেও সংশ্লিষ্ট নথিতে থাকা অন্যান্য তথ্য থেকে নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে। ফলে শুধু নাম মুছে দিয়ে নথি প্রকাশ করলেই সম্ভাব্য ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। বিচারপতি অমিত মহাজনের সিঙ্গল বেঞ্চ জানিয়েছে, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং সরকারি কাজের জবাবদিহি গুরুত্বপূর্ণ হলেও জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষার প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না।
RTI-তে মোদীর বিদেশ সফরের বিমান সংক্রান্ত নথি নিয়ে কী জানাল দিল্লি হাই কোর্ট (Delhi High Court)?
এই মামলার সূত্রপাত এক ব্যক্তির দায়ের করা আরটিআই আবেদনকে কেন্দ্র করে। ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল থেকে ভারতীয় বায়ুসেনার বিমান ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফর সংক্রান্ত তথ্য চেয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিদেশ সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘স্পেশাল ফ্লাইট রিটার্নস’ বা এসএফআর নথির প্রথম ও দ্বিতীয় অংশের প্রতিলিপি চাওয়া হয়েছিল। ভারতীয় বায়ুসেনা সফর সংক্রান্ত কিছু তথ্য দিতে রাজি হলেও নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট এসএফআর নথি প্রকাশ করতে অস্বীকার করে। পরবর্তী আপিলেও সেই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। এরপর বিষয়টি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের কাছে পৌঁছয়। ২০২০ সালের ৮ জুলাই কমিশন বায়ুসেনাকে এসএফআর-২ নথির কপি আবেদনকারীকে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই দিল্লি হাইকোর্টের (Delhi High Court) দ্বারস্থ হয় বায়ুসেনার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
আরও পড়ুন: সৌদিতে হামলার জের! নিরাপত্তার কারণে একাধিক উড়ান বাতিল করল ইন্ডিগো, বিপাকে যাত্রীরা
শুনানিতে বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়, ওই নথিতে শুধু যাত্রীদের নামই নয়, তাঁদের পদমর্যাদা, দায়িত্ব, পরিচয় সংক্রান্ত নম্বর, বিমানের বিবরণ, যাত্রীর সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও থাকতে পারে। আদালতের মতে, এই তথ্যগুলির মধ্যে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় মুছে দিলেও বাকি তথ্য প্রকাশ্যে থাকা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেই কারণেই তথ্য জানার অধিকার আইন, ২০০৫-এর ৮(১)(ক) ও ৮(১)(ছ) ধারার আওতায় সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ করেছে আদালত।
আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, সরকারি অর্থে কোনও সফর সম্পন্ন হয়েছে বলেই সেই সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তথ্য জানার অধিকার আইন সরকারি কাজের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই অধিকার নিরঙ্কুশ নয়। কোনও তথ্য প্রকাশের ফলে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার বা কোনও ব্যক্তির জীবন ও শারীরিক সুরক্ষা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেই সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে হবে। এই প্রসঙ্গে আদালত সিবিএসই বনাম আদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুপ্রিম কোর্ট বনাম সুভাষ চন্দ্র আগরওয়াল মামলার পর্যবেক্ষণেরও উল্লেখ করেছে। আদালতের মতে, তথ্য প্রকাশের সম্ভাব্য প্রভাব বিচার করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা সংস্থাগুলির মতামত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আরও পড়ুন: টোল প্লাজাগুলির পার্কিং ও শৌচাগারের মান আরও উন্নত! নতুন নির্দেশিকা জারি করল NHAI
শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনের ২০২০ সালের ৮ জুলাইয়ের নির্দেশ খারিজ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court)। আদালতের পর্যবেক্ষণ, কেবল নিরাপত্তাকর্মীদের নাম ও পরিচয় মুছে দিয়ে নথি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া যথেষ্ট নয়, কারণ তাতে নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও এমন তথ্য প্রকাশের পক্ষে একমাত্র যুক্তি হতে পারে না, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এই রায়ের ফলে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের বিমানযাত্রা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট এসএফআর নথি প্রকাশ না করার ক্ষেত্রে বায়ুসেনার সিদ্ধান্তই বহাল থাকল। স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও যে তথ্য প্রকাশের সিদ্ধান্তে সমান গুরুত্বপূর্ণ, দিল্লি হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণে তা আরও একবার স্পষ্ট হল।














