বাংলা হান্ট ডেস্ক : ফেসবুকের একটি পোস্ট ঘিরে দায়ের হওয়া মামলা এবার নতুন মোড় নিল কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court)। তদন্তে কোনও সূত্র পাওয়া যায়নি বলে পুলিশের দেওয়া ‘নিল’ রিপোর্টে সিলমোহর দেয়নি আদালত। বরং সেই রিপোর্ট খারিজ করে মামলাটি ফের তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, তদন্তে সাইবার-ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করতে বলেছে আদালত।
মামলার শুনানিতে বিচারপতি উদয় কুমার আরও স্পষ্ট করেছেন, সোশাল মিডিয়ায় জাতিগত পরিচয় তুলে অপমানের অভিযোগও এসসি-এসটি আইনের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে।
জাতিগত পরিচয় তুলে অপমানের রায় হাইকোর্টের (Calcutta High Court)
ঘটনার সূত্রপাত ২০২২ সালে। তফসিলি সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বেহালা থানায় অভিযোগ করেন রবিউল ইসলাম বুলবুল ও সায়ন দত্তের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, ফেসবুকে তাঁকে নিশানা করে জাতি ও ধর্মের পরিচয় নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়েও অশ্লীল এবং অপমানজনক কথা লেখা হয় বলে দাবি করেন অভিযোগকারী। প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট পোস্টের স্ক্রিনশটও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু হওয়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অভিযোগে উল্লেখ করা ফেসবুকের লিঙ্কগুলিও পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু তদন্তের শেষে অভিযুক্ত ব্যক্তির অনলাইন তথ্য সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনও সূত্র হাতে আসেনি বলে জানায় পুলিশ। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য ছিল, কলকাতা সাইবার থানার মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে ইউজারের প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছ থেকে সেই তথ্য পাওয়া যায়নি। সেই কারণ দেখিয়েই ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি আলিপুরের বিশেষ আদালতে ‘নিল’ ফাইনাল রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়।
পুলিশের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি অভিযোগকারী। রিপোর্টের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আলিপুরের স্পেশাল কোর্টে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু সেই আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। নিম্ন আদালতের যুক্তির কেন্দ্রে ছিল অভিযোগকারীর আগের মামলাগুলি। আদালতের সামনে উঠে আসে, একই ব্যক্তির করা আরও তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। সেই কারণে বর্তমান মামলায় তদন্তকারীরা যখন কোনও সূত্রের সন্ধান না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন, তখন তাঁদের রিপোর্ট গ্রহণ করার পক্ষেই মত দেয় বিশেষ আদালত। এরপর নিম্ন আদালতের সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেই হাই কোর্টে আসেন অভিযোগকারী। তাঁর আবেদনের শুনানিতে বিচারপতি উদয় কুমার নির্দেশ দেন, ‘কোনও তথ্য মেলেনি’ এই কারণ দেখিয়ে মামলার তদন্ত বন্ধ করে দেওয়া যাবে না। নতুন করে তদন্ত করতে হবে।
এই মামলার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘জনসমক্ষে অপমান’-এর আইনি ব্যাখ্যা। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, প্রকাশ্য রাস্তা বা বাজারের মতো জায়গাতেই কেবল ‘জনসমক্ষে’ অপমানের ঘটনা ঘটতে হবে—এমন নয়। সোশাল মিডিয়ায় জাতিগত পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে অপমান করার ঘটনাও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এসসি-এসটি আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় আসতে পারে।
১৯৮৯ সালের এসসি-এসটি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনে তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে অত্যাচার এবং অপরাধের ক্ষেত্রে একাধিক শাস্তির বিধান রয়েছে। আইনজীবী মহলের একাংশের মতে, ৩(১)(আর) এবং ৩(১)(এস) ধারায় ইচ্ছাকৃত ভাবে অপমান বা ভয় দেখিয়ে কোনও তফসিলি জাতি বা উপজাতিভুক্ত ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হেয় করার ক্ষেত্রে কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সাজা ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। আরও গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ৩(২)(ভি) ধারায় শাস্তির মাত্রা অনেক বেশি। সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিতে ১০ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধানও থাকতে পারে।

আরও পড়ুন : পুজোর আগেই DA বৃদ্ধি নিয়ে সরকারি কর্মীদের জন্য বড় আপডেট
তবে এই মামলায় এখনই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন নয়। হাই কোর্টের নির্দেশ মূলত তদন্তকে ফের সক্রিয় করেছে। নতুন তদন্তে সোশাল মিডিয়ার পোস্টগুলির সত্যতা, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য থেকে কী প্রমাণ মেলে, তার উপরই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নির্ভর করবে।













