বাংলা হান্ট ডেস্ক: দীর্ঘ ১৫ বছর পর ফের বঙ্গে (West Bengal) পালাবদল ঘটেছে। তৃণমূলকে পরাজিত করে বঙ্গে প্রথম সরকার গঠন করতে চলেছে বিজেপি। তবে, নতুন সরকার গঠনের আগে পূর্বের তৃণমূল সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গ সবথেকে বড় ধাক্কা খেয়েছে অর্থনীতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে। এদিকে, অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটানোর ক্ষেত্রে সবথেকে অপরিহার্য বিষয় হল বিনিয়োগ। বাংলার কথা বলতে গেলে, বিনিয়োগই হয়ে উঠেছে বঙ্গের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় খলনায়ক। পশ্চিমবঙ্গে, তৃণমূল সরকারের আমলে ৬,৬০০-র বেশি সংস্থা হয় বন্ধ হয়ে গেছে অথবা অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে। এতে রাজ্যের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থা হিন্দুস্তান মোটরসের কারখানাটি ২০১৪ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে। অপরদিকে, বাংলার আরেকটি বড় কোম্পানি ডানলপ ইন্ডিয়ার কারখানা, যেটির একসময় সারা দেশে শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল, সেটিও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
বঙ্গের (West Bengal) শিল্পে করুণ চিত্র:
টাটা-আম্বানি-বিড়লাকেও হতাশ করেছে বাংলা: বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনও রাজ্যে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি বিনিয়োগের রাস্তা থমকে যায় তখন সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলার শিল্প পতনের জন্য কোনও একক সংস্থা দায়ী নয়, বরং পুরোনো শিল্পগুলির আধুনিকীকরণে ব্যর্থতা থেকে শুরু করে নতুন প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের অভাব এবং অর্থনৈতিক ও নীতি সংস্কারের অভাবের সম্মিলিত প্রভাবেই এই চিত্র সামনে এসেছে।

এদিকে, বঙ্গের এহেন অবস্থা পরিলক্ষিত করে একাধিক বড় সংস্থা বাংলা ছেড়ে গুজরাট এবং মহারাষ্ট্রে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর সবথেকে বড় উদাহরণ হল রতন টাটার স্বপ্নের ন্যানো প্রকল্প। রতন টাটা এটিকে বাংলার সিঙ্গুরে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ২০০৮ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যাওয়ায়, ন্যানোকে গুজরাটের সানন্দে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে গুজরাটের সানন্দ দেশের অন্যতম প্রধান অটো হাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এদিকে, সিগারেট প্রস্তুতকারী সংস্থা ITC একসময় বাংলার রাজধানী কলকাতায় অবস্থিত ছিল। পরে এই সংস্থা গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এছড়াও, পেট্রোকেমিক্যালের বৃহৎ সংস্থা রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজও ধীরে ধীরে বাংলায় তাদের উপস্থিতি কমিয়ে এনে গুজরাটের জামনগরে তা প্রসারিত করে। আর এইভাবেই টাটা, আম্বানি এবং বিড়লা গ্রুপও বঙ্গে তাদের পুরোনো ইউনিটগুলি বন্ধ করে গুজরাট ও মহারাষ্ট্রে সরিয়ে নেয়।
ফাইন্যান্স ও অটোমোবাইল সেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: জানিয়ে রাখি যে, ২০১৩ সালে সারদা গ্রুপ কেলেঙ্কারির কারণে বাংলার ফাইন্যান্স সেক্টর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই কেলেঙ্কারির তীব্রতা এতটাই ছিল যে তার ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। সেই সময় রোজ ভ্যালি গ্রুপকে নিয়েও আরেকটি কেলেঙ্কারি সামনে আসে। যার ফলে পরবর্তীকালে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। বঙ্গের ক্ষেত্রে সবথেকে ভয়াবহ বিষয় হল হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় প্রতিষ্ঠিত ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিগুলিও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়েছে। অটোমোবাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং উৎপাদন সেক্টরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ভারতে সত্যিই দেখা যাবে না ফুটবল বিশ্বকাপ? রিলায়েন্সের প্রস্তাব ফেরাল ফিফা, চিন্তায় অনুরাগীরা
পাট শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে: উল্লেখ্য যে, একসময় পাট শিল্প ছিল বাংলার আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস। কিন্তু, তৃণমূল সরকারের আমলে একাধিক পাটকল হয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন এই শিল্প কার্যত ধুঁকছে। সহজভাবে বলতে গেলে, বাংলার পাট শিল্প ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়েছে। বাংলার বৃহত্তম পাট কোম্পানি, ন্যাশনাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন, ২০১৮ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও, ইউনিয়ন জুট মিলস থেকে শুরু করে খড়দহ জুট মিল, কনিশন জুট মিল এবং আলেকজান্দ্রা জুট মিল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।এদিকে, বাংলার ঐতিহাসিক মিল পোর্ট গ্লস্টারও সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন: বিজেপি জেতায় বঙ্গে শীঘ্রই আয়ুষ্মান যোজনা! শুরু হতে চলেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প
কীভাবে বিষয়গুলির সমাধান হবে: বর্তমানে বাংলায় বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন যে উত্তর প্রদেশ এখন যেমন একটি নতুন বিনিয়োগ কেন্দ্রের রূপান্তরিত হয়েছে বাংলার ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে। মূলত, ব্যবসায়ীরা সেখানেই বিনিয়োগ করেন যেখানে সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। যে সংস্থাগুলি বাংলা থেকে স্থানান্তরিত হয়েছিল তারা সেইসব জায়গায় বিনিয়োগ করেছিল যেখানে ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ হয়। এমতাবস্থায়, পশ্চিমবঙ্গ কে ব্যবসার ক্ষেত্রে অনুকূল হিসেবে গড়ে তোলাই বিজেপি সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।












