বাংলা হান্ট ডেস্ক: পেট্রলে ইথানল (Ethanol) মেশানো নিয়ে কয়েক মাস আগে দেশজুড়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে এবার বিস্ফোরক দাবি করলেন কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গডকরী (Nitin Gadkari)। তাঁর বক্তব্য, পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো বা ই২০ জ্বালানির (E20 Fuel) বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ দেখা গিয়েছিল, তার পিছনে ছিল অর্থের বিনিময়ে চালানো একটি পরিকল্পিত প্রচার। মঙ্গলবার কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ়ের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি। নীতিনের দাবি, মাস তিনেক আগে ই২০ নিয়ে যাঁরা জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাঁদের সেই ক্ষোভ এখন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গিয়েছে। তাঁর কথায়, “তিন মাস আগে ই২০ জ্বালানির বিরুদ্ধে অনেকে বড় গলায় প্রতিবাদ করেছিলেন, এখন সেই ক্ষোভ মিলিয়ে গিয়েছে। আসলে ওটা একটা পেড ক্যাম্পেন ছিল।” তবে এই অভিযোগের সমর্থনে তিনি কোনও নির্দিষ্ট প্রমাণ দিয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। ফলে তাঁর মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিকল্প জ্বালানি বিতর্কে বিস্ফোরক দাবি নিতীন গডকরীর (Nitin Gadkari)
নীতিনের (Nitin Gadkari) এই বক্তব্যের ঠিক আগেই ইথানল-ভিত্তিক জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ১৯৮৯ সালের কেন্দ্রীয় মোটরযান বিধিতে সংশোধন এনে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এর ফলে ১০০ শতাংশ ইথানল বা ই১০০ জ্বালানিতে চলার উপযোগী ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির ব্যবহার আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বর্তমানে রাস্তায় চলা সমস্ত পেট্রলচালিত গাড়িতে সরাসরি ই১০০ ব্যবহার করা যাবে। এই জ্বালানির জন্য গাড়িতে উপযুক্ত ইঞ্জিন ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরেই বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে সওয়াল করে আসছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। তাঁর মতে, ইথানলের মতো জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির উপর ভারতের নির্ভরতা কমবে। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমলে পরিবেশের উপরেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: টোল প্লাজার ২০ কিমির মধ্যে বসবাসকারীদের জন্য সুখবর! কত টাকায় মিলবে অ্যানুয়েল কনসেশন পাস?
তবে ই২০ জ্বালানির ব্যবহার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছিল, তার পিছনে কয়েকটি প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক যুক্তিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সাধারণ পেট্রলের তুলনায় ইথানলের শক্তি উৎপাদনের ক্ষমতা কম হওয়ায় ই২০ ব্যবহারে গাড়ি ও বাইকের মাইলেজ প্রায় ২ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বিশেষ করে পুরনো গাড়ির ক্ষেত্রে এই জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৩ সালের আগে তৈরি কিছু গাড়িতে ই২০ ব্যবহারের আগে নির্মাতার নির্দেশিকা যাচাই করার প্রয়োজন হতে পারে। গাড়ির ইঞ্জিন এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জ্বালানির সামঞ্জস্য না থাকলে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ক্ষয় বা ক্ষতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গাড়ির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং গ্রাহকদের সচেতনতার বিষয়টিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই ই২০ নিয়ে সাধারণ গাড়ির মালিকদের একাংশের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছিল।
ইথানল উৎপাদন বাড়ানোর ফলে কৃষিক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। ইথানল তৈরিতে আখ, ভুট্টা ও চালের মতো কৃষিপণ্যের ব্যবহার বাড়লে খাদ্যশস্যের জোগানের উপর চাপ পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু ফসলের চাষ বাড়াতে অতিরিক্ত জলের প্রয়োজন হলে ভূগর্ভস্থ জলসম্পদের উপর চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যশস্যের দামেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। তাই বিকল্প জ্বালানির প্রসার ঘটাতে গিয়ে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকদের স্বার্থ এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও মাথায় রাখা প্রয়োজন। যদিও নীতিন গডকরী ইথানল ব্যবহারের আর্থিক ও পরিবেশগত সুবিধার উপর জোর দিয়েছেন, তবু এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে উৎপাদন, প্রযুক্তি এবং পরিকাঠামোর সঠিক ব্যবস্থাপনার উপর।

আরও পড়ুন: একের পর এক iPhone Duo-র স্ক্রিনে ‘ক্র্যাক’-এর অভিযোগ! বড় সিদ্ধান্ত Apple-এর
এদিকে, দেশের বিভিন্ন জাতীয় সড়কের বেহাল দশা নিয়ে সমাজমাধ্যমে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন নীতিন (Nitin Gadkari)। তাঁর বক্তব্য, সড়কের গুণমানের সঙ্গে কোনও অবস্থাতেই আপস করা হবে না। সম্প্রতি প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০টি জাতীয় সড়ক প্রকল্পের কাজ পর্যালোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। আগামী দু’বছরের মধ্যে জাতীয় সড়কে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে আর দুর্ভোগ পোহাতে হবে না বলেও আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। যদিও এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়, তা সময়ই বলবে। একদিকে ই২০ জ্বালানির বিরোধিতার পিছনে ‘পেড ক্যাম্পেন’-এর অভিযোগ, অন্যদিকে ই১০০ ব্যবহারের জন্য আইনি স্বীকৃতি এবং জাতীয় সড়কের উন্নয়ন নিয়ে আশ্বাস—সব মিলিয়ে জ্বালানি নীতি ও পরিবহণ পরিকাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে বিকল্প জ্বালানির প্রসারে সরকারের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার উত্তর মিলবে আগামী দিনে।














