বাংলা হান্ট ডেস্ক: একসময় শিশুদের উচ্চতা বৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয় পরিবারগুলির ঘরে ঘরে পৌঁছে গিয়েছিল কমপ্ল্যান (Complan)। ছোটবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই পুষ্টিকর পানীয়ের নাম আজও অনেকের কাছে পরিচিত। তবে কমপ্ল্যানের এই সফল (Success Story) জনপ্রিয়তার পিছনে শুধু পুষ্টির ধারণাই নয়, রয়েছে দীর্ঘদিনের বিজ্ঞাপন কৌশল, তারকাদের উপস্থিতি এবং বাজারে টিকে থাকার লড়াই। ১৯৫৪ সালে ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা গ্ল্যাক্সো যুক্তরাজ্যে সৈনিকদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের কথা মাথায় রেখে এই পানীয় চালু করে। পরে অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা রোগীদের পুষ্টির পরিপূরক হিসেবেও এর ব্যবহার বাড়ে। ১৯৬৪ সালে ভারতে (India) প্রবেশের পর ধীরে ধীরে বদলে যায় ব্র্যান্ডটির পরিচিতি। চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একটি পুষ্টিকর পানীয় থেকে এটি হয়ে ওঠে শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য বিশেষভাবে তৈরি পানীয়।
কমপ্ল্যান ব্র্যান্ডের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
কমপ্ল্যানের জনপ্রিয়তাকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দেয় তার বিজ্ঞাপন। বিশেষ করে ১৯৮০-র দশকের গোড়ার দিকে বিজ্ঞাপন সংস্থা লিও বার্নেটের তৈরি প্রচারাভিযান ভারতীয় দর্শকদের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। ‘আই অ্যাম আ কমপ্ল্যান বয়’, কিংবা ‘আই অ্যাম আ কমপ্ল্যান গার্ল’—এই পরিচিত স্লোগান একসময় শিশুদের মুখে মুখে ফিরত। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কমপ্ল্যানকে শুধু একটি পানীয় হিসেবে নয়, বরং শিশুদের বেড়ে ওঠা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই প্রচারাভিযানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বলিউড অভিনেতা শহীদ কাপুর এবং আয়েশা টাকিয়ার শৈশবের স্মৃতিও। তাঁদের শিশুশিল্পী হিসেবে উপস্থিতি বিজ্ঞাপনটিকে আরও পরিচিত করে তোলে। ফলে বাড়ির বড়দের কাছে পুষ্টিকর পানীয় হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পাশাপাশি শিশুদের কাছেও ব্র্যান্ডটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে (Success Story)।
আরও পড়ুন: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৫০০ মিটার উচ্চতায় লে-তে লাদাখ হাইকোর্ট বেঞ্চ! উদ্বোধন করলেন প্রধান বিচারপতি
তবে কমপ্ল্যানের যাত্রাপথ সব সময় মসৃণ ছিল না। ১৯৯৪ সালে মার্কিন খাদ্য সংস্থা ক্রাফট হেইঞ্জ ব্র্যান্ডটির মালিকানা অধিগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে শিশুদের বৃদ্ধির হার বাড়ানোর দাবি সামনে রেখে পণ্যের প্রচার চালানো হয়। কিন্তু বিজ্ঞাপনে করা এই ধরনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ২০০৭ সালে অ্যাডভার্টাইজিং স্ট্যান্ডার্ডস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (ASCI) এবং ২০১০ সালে মহারাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) কমপ্ল্যানের বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আপত্তি তোলে। শিশুদের উচ্চতা ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পানীয়টির ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলেও বিতর্ক তৈরি হয়। পাশাপাশি পণ্যে চিনির পরিমাণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই বিতর্ক কমপ্ল্যানের বিজ্ঞাপন কৌশল এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।
এদিকে বাজারে কমপ্ল্যানের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে হরলিক্স। দুই ব্র্যান্ডের মধ্যে প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় পুষ্টিকর পানীয়ের বাজারের পরিচিত ছবি। ২০১৮ সালে ক্যাডিলা হেলথকেয়ারের সঙ্গে যুক্ত জাইডাস ওয়েলনেস কমপ্ল্যান অধিগ্রহণ করে। মালিকানা বদলালেও ব্র্যান্ডটির পরিচিতি ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। সময়ের সঙ্গে অভিভাবকদের চাহিদা এবং শিশুদের পুষ্টি সম্পর্কে ধারণা বদলেছে। শুধু উচ্চতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা আর যথেষ্ট নয়—এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বিজ্ঞাপনের ভাষাতেও পরিবর্তন আনা হয়। মাধুরী দীক্ষিত ও দক্ষিণ ভারতীয় অভিনেত্রী স্নেহার মতো তারকাদের নিয়ে প্রচার চালিয়ে নতুন প্রজন্মের পরিবারের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করে সংস্থাটি।

আরও পড়ুন: ‘উড়ন্ত গাড়ি’ এনে তাক লাগালেন মাস্ক! টেসলা রোডস্টার কিনতে করতে হবে কত খরচ?
সম্প্রতি ‘থোড়া প্ল্যান, থোড়া কমপ্ল্যান’ প্রচারাভিযানে তরুণ ক্রিকেটার বৈভব সূর্যবংশীকে সামনে এনে ফের আলোচনায় এসেছে ব্র্যান্ডটি। নতুন এই প্রচারে শুধু উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে শৃঙ্খলা, মনোযোগ, সহনশীলতা এবং সামগ্রিক বিকাশের মতো দিকগুলির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের উপস্থাপনার ধরন বদলাতে চাইছে কমপ্ল্যান। তবে পরিবর্তিত বাজার, বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা এবং বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুনের মধ্যে ব্র্যান্ডটির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় বাজারে উপস্থিত থাকা কমপ্ল্যানের ইতিহাস তাই শুধু একটি পানীয়ের জনপ্রিয়তার কাহিনি নয়, বরং বিজ্ঞাপন, ব্যবসায়িক কৌশল এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার দীর্ঘ লড়াইয়েরও উদাহরণ (Success Story)।














