বাংলাহান্ট ডেস্ক: চম্বলের নাম শুনলেই একসময় মনে পড়ত বন্দুকের গর্জন, দুর্গম গিরিখাত আর ঠগীদের গল্প। সেই চম্বলের (Chambal) মোরেনা জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে উঠে এসে সম্পূর্ণ অন্য এবং সফল (Success Story) পরিচয় তৈরি করেছেন দেব প্রভাকর সিং তোমর। ইউপিএসসি পরীক্ষায় ৬২৯তম স্থান অর্জন করে তিনি ভারতীয় রেলওয়ের ট্রাফিক সার্ভিসে (IRTS) জায়গা করে নিয়েছেন। তবে তাঁর এই সাফল্য শুধুমাত্র একটি কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের কঠিন অতীত, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই, বাবার দেখানো শিক্ষার পথ এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য একের পর এক ব্যর্থতার পরেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কাহিনি।
দেব প্রভাকর সিং তোমরের অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
দেব প্রভাকরের জীবনের মোড় ঘোরানোর অন্যতম অধ্যায় অবশ্য বিদেশে। IIT রোপড় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর তিনি ইউরোপের নামী সংস্থা ফিলিপসে চাকরি পান। নেদারল্যান্ডসে গিয়ে বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। আমস্টারডামের নিশ্চিন্ত জীবন এবং প্রায় ৮৮ লক্ষ টাকার বার্ষিক প্যাকেজের চাকরি তাঁর সামনে স্থায়ী ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু মনের মধ্যে তখন অন্য স্বপ্ন। দেশের মাটিতে ফিরে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছে ক্রমশ প্রবল হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নকেই অগ্রাধিকার দিয়ে বিদেশের চাকরি ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন দেব এবং শুরু করেন ইউপিএসসির প্রস্তুতি (Success Story)।
তবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য তাঁর কাছে একবারে আসেনি। প্রথম দুই বার প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতেই সামান্য ব্যবধানে আটকে যান তিনি। তৃতীয় প্রচেষ্টায় লিখিত পরীক্ষা পেরিয়ে পৌঁছে যান ইন্টারভিউ পর্যন্ত, কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। দেব তা করেননি। দিল্লিতে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় তাঁর পরিশ্রমের ফল মেলে। অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক ৬২৯ অর্জন করে স্বপ্ন পূরণ করেন তিনি। বর্তমানে রেল মন্ত্রকের অধীনে দায়িত্ব পালন করছেন দেব প্রভাকর সিং তোমর।
তাঁর এই লড়াইয়ের পিছনে রয়েছে পরিবারের এক কঠিন ইতিহাস। জোশ টকস-এ নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে দেব জানান, প্রায় ৭৫ বছর আগে পারিবারিক টানাপোড়েন ও স্থানীয় সংঘাতের কারণে তাঁর ঠাকুরদা চম্বলের গিরিখাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানীয়ভাবে এমন মানুষদের ‘বাগী’ বলা হত। সেই পথ বেছে নেওয়ার পর পরিবারকে চরম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। পরবর্তীকালে তাঁর এক কাকাও একই পথে চলে যান। কিন্তু দেবের বাবা সেই জীবন থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারকে না জানিয়েই গোয়ালিয়রে চলে গিয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে শিক্ষকতা শুরু করেন। বাবার সেই সিদ্ধান্তই যেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন রাস্তা খুলে দেয়। দেবের কাছে শিক্ষাই হয়ে ওঠে পরিবারের অতীত বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

একদিকে ঠাকুরদার জীবনে ছিল চম্বলের গিরিখাত, অন্যদিকে বাবার হাতে ছিল বই ও শিক্ষার আলো। সেই পথ ধরেই দেব পৌঁছেছেন IIT-তে, সেখান থেকে নেদারল্যান্ডসের নামী সংস্থায় এবং শেষ পর্যন্ত দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার সাফল্যে। বিদেশের আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে UPSC-র প্রস্তুতি নেওয়া থেকে শুরু করে পরপর ব্যর্থতার পরেও লড়াই চালিয়ে যাওয়া—তাঁর যাত্রাপথে বারবার এসেছে কঠিন সিদ্ধান্ত। আর শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে পরিবারের কয়েক দশকের গল্প। চম্বলের এক পরিবারের অতীত যেখানে একসময় পরিচিত ছিল ‘বাগী’ শব্দে, সেখানেই পরবর্তী প্রজন্মের পরিচয় তৈরি হয়েছে শিক্ষা, পরিশ্রম এবং দেশের প্রশাসনিক পরিষেবার মাধ্যমে (Success Story)।













