বাংলাহান্ট ডেস্ক: মাত্র ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণির পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাঁকে। সংসারের আর্থিক অনটনের কারণে অল্প বয়সেই সফলতা (Success Story) অর্জন করতে নামতে হয়েছিল কর্মজীবনে। একসময় সিমেন্টের পাইপ ও মোমবাতি তৈরির কাজ করে দিনে রোজগার করতেন মাত্র ৩০ টাকা। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হার মানেননি পাঞ্জাবের (Punjab) রাজিন্দর গুপ্তা (Rajinder Gupta)। নিজের পরিশ্রম, ব্যবসায়িক বুদ্ধি এবং ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা নিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন বিশাল শিল্প সাম্রাজ্য। আজ তিনি ট্রাইডেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। সুতা, টেরি টাওয়েল, কাগজ, রাসায়নিক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো একাধিক ক্ষেত্রে ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর সংস্থার ব্যবসা। সামান্য রোজগার থেকে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার এই কাহিনি দেখায়, জীবনের শুরুটা কঠিন হলেও সঠিক পরিকল্পনা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সাফল্যের পথ তৈরি করা সম্ভব।
রাজিন্দর গুপ্তার অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story)
১৯৫৯ সালের ২ জানুয়ারি পাঞ্জাবের ভাটিণ্ডায় জন্ম রাজিন্দর গুপ্তার। তাঁর বাবা ছিলেন ছোট মাপের তুলার ব্যবসায়ী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। ফলে ইচ্ছা থাকলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাননি তিনি। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নবম শ্রেণি শেষ করে স্কুল ছাড়তে হয় তাঁকে। তবে পড়াশোনায় ইতি টানলেও জীবনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থামাননি রাজিন্দর। অল্প বয়সেই বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত হন। সিমেন্টের পাইপ তৈরি করা থেকে শুরু করে মোমবাতি বানানো—এমন নানা কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। দিনে প্রায় ৩০ টাকা আয় করেই চলত তাঁর জীবন। কিন্তু অন্যের অধীনে কাজ করে উপার্জনের পাশাপাশি নিজের ব্যবসা গড়ে তোলার স্বপ্নও দেখতেন তিনি। সেই লক্ষ্যেই বাজারের চাহিদা, উৎপাদন এবং ব্যবসার খুঁটিনাটি বোঝার চেষ্টা চালিয়ে যান।
আরও পড়ুন: মক্কা-মদিনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা! সৌদিতে থাকা ভারতীয়দের জন্য দিল্লির জরুরি সতর্কবার্তা
রাজিন্দরের ব্যবসায়িক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৮৫ সালে। ওই বছর তিনি অভিষেক ইন্ডাস্ট্রিজ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই সংস্থায় প্রায় ৬.৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। ছোটখাটো কাজের অভিজ্ঞতা থেকে শিল্পক্ষেত্রে প্রবেশের এই পদক্ষেপ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত। তবে ব্যবসা শুরু করলেই যে সাফল্য আসবে, তা নয়। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল সংগ্রহ, দক্ষ কর্মী নিয়োগ এবং বাজারে নিজের জায়গা তৈরি করা—সব ক্ষেত্রেই ছিল নানা চ্যালেঞ্জ। সেই বাধা সামলে শিল্পক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান মজবুত করার দিকে মন দেন রাজিন্দর। একটি মাত্র ব্যবসার উপর নির্ভর না করে ভবিষ্যতে একাধিক ক্ষেত্রে কাজ ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও করেন তিনি। বাজারের চাহিদা বুঝে উৎপাদন বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দিকে নজর রাখাই হয়ে ওঠে তাঁর কৌশলের অন্যতম দিক।
১৯৯০ সালের ১৮ এপ্রিল ট্রাইডেন্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজিন্দর গুপ্তার ব্যবসায়িক যাত্রা আরও বড় পরিসর পায়। পরের বছর, ১৯৯১ সালে, স্পিনিং মিল স্থাপনের জন্য একটি যৌথ উদ্যোগ গড়ে ওঠে। এই মিলগুলিতে তুলার মতো প্রাকৃতিক আঁশ থেকে সুতা তৈরি করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য উৎপাদনে কাজে লাগে। সুতা উৎপাদনের হাত ধরে ট্রাইডেন্টের বস্ত্র ব্যবসা ক্রমশ বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে সংস্থার পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয় টেরি টাওয়েল এবং বিভিন্ন ধরনের হোম টেক্সটাইল। বিশেষ ধরনের বুননের কারণে এই তোয়ালেগুলি জল শোষণে কার্যকর। বাড়ি, হোটেল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে এই ধরনের পণ্যের চাহিদা থাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে একটি শিল্প উদ্যোগ বৃহত্তর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের রূপ নিতে শুরু করে।

আরও পড়ুন: জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এবার ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’, ৩০ অক্টোবর নজিরবিহীন কর্মসূচি ইন্ডিয়া জোটের
বর্তমানে ট্রাইডেন্ট গ্রুপের ব্যবসা শুধু বস্ত্রশিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। সুতা ও টেরি টাওয়েলের পাশাপাশি কাগজ, রাসায়নিক এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও সংস্থার কার্যক্রম রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছেছে তাদের পণ্য। ওয়ালমার্ট, আইকিয়া, র্যালফ লরেন এবং ক্যালভিন ক্লেইনের মতো পরিচিত ব্র্যান্ডের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গেও ট্রাইডেন্টের যোগ রয়েছে বলে জানা যায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে পণ্যের গুণমান বজায় রাখা, প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বড় অর্ডার সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী রাখার উপর জোর দিতে হয় সংস্থাকে। একসময় দিনে ৩০ টাকা রোজগার করা রাজিন্দর গুপ্তার এই দীর্ঘ যাত্রা তাই কেবল আর্থিক সাফল্যের গল্প নয়; প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্য ধরে রাখা এবং সুযোগকে কাজে লাগানোর একটি উদাহরণ (Success Story)।














