বাংলাহান্ট ডেস্ক: ‘এক দেশ, এক নিয়ম’ নীতির উপর নির্ভর করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (Uniform Civil Code) কার্যকর করার পথে আরও আরও এক রাজ্য। সোমবার অসম বিধানসভায় ইউসিসি সংক্রান্ত বিল পেশ করেছে বিজেপি সরকার। বিয়ে, বিবাহ বিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ, লিভ-ইন সম্পর্ক-সহ পারিবারিক জীবনের একাধিক ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক পৃথক ব্যক্তিগত আইন তুলে দিয়ে সকল নাগরিকের জন্য এক অভিন্ন আইনি কাঠামো গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু অসমের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতেও একটি বড় বার্তা বহন করছে। কারণ বহুদিন ধরেই বিজেপি দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালুর পক্ষে সওয়াল করে আসছে। আগামী মঙ্গলবার বিধানসভায় এই বিল নিয়ে ভোটাভুটি হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
এবার আসামেও চালু হতে চলেছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (Uniform Civil Code)
চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনের সময় বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে অসমে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের পথেই এখন এগোচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার। ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পক্ষে সুপারিশ করা হলেও স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক ব্যক্তিগত আইন বহাল রয়েছে। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে বিয়ে, ডিভোর্স ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নিয়ম আলাদা। অসম সরকার সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন এনে সকল নাগরিকের জন্য একক আইন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত প্রস্তাবিত আইনের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করা হয়নি, তবুও গত ১৩ মে মুখ্যমন্ত্রী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছিলেন। তাঁর কথায়, বিয়ের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ, মহিলাদের সম্পত্তির অধিকারের সুরক্ষা, বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ, বিয়ে ও ডিভোর্সের বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রেশন এবং লিভ-ইন সম্পর্ককে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার মতো বিষয়গুলি এই আইনের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অসম সরকারের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, রাজ্যের আদিবাসী সম্প্রদায়কে এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হবে। তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপর কোনও প্রভাব পড়বে না বলেও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah-ও জানিয়েছেন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কোনওভাবেই আদিবাসীদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না এবং তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকবে। তবে অসমে এই আইন ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারণ রাজ্যে আদিবাসীদের জনসংখ্যা প্রায় ১২.৪৫ শতাংশ এবং মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৩৪.২২ শতাংশ। বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আইন কার্যকর করার আগে সর্বদলীয় আলোচনা এবং সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। যদিও বিজেপির দাবি, এই আইন সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করবে এবং বিশেষ করে নারীদের অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
দেশের মধ্যে প্রথম রাজ্য হিসেবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তরাখণ্ড অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করে। এরপর মার্চ মাসে গুজরাতেও এই সংক্রান্ত আইন পাশ হয়। অন্যদিকে মধ্য প্রদেশ সরকার ইতিমধ্যেই খসড়া তৈরির জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি গোয়াতেও বহু বছর ধরেই ‘গোয়া সিভিল কোড’ কার্যকর রয়েছে, যা কার্যত অভিন্ন দেওয়ানি বিধিরই একটি রূপ বলে মনে করা হয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, অসমের এই পদক্ষেপ দেশের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিকেও একই পথে হাঁটার ক্ষেত্রে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি জাতীয় স্তরে এই ইস্যুকে আরও জোরদার করতে পারে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের।

আরও পড়ুন: ফের ময়দানে তৃণমূলনেত্রী! পুরভোটের আগে মেয়র-কাউন্সিলরদের কালীঘাটে তলব মমতার
২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি যে তিনটি বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল রাম মন্দির নির্মাণ, জম্মু-কাশ্মীর থেকে ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার এবং দেশজুড়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা। প্রথম দুটি প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে ইউসিসিকেই (Uniform Civil Code) এখন বিজেপির পরবর্তী বড় রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে অসম সরকারের এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র একটি রাজ্যের আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টা নয়, বরং জাতীয় রাজনীতিতে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ হিসেবেও তা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এখন নজর আগামীকালের বিধানসভা ভোটাভুটির দিকে। সেখানে বিলটি পাশ হলে উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর অসমও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পথে হাঁটা রাজ্যগুলির তালিকায় আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখাবে।













