বাংলাহান্ট ডেস্ক: মুম্বাইয়ের একটি আবাসনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কয়েকটি লাড্ডুর ছবি পোস্ট করেই সফর শুরু হয়েছিল। সেই ছোট্ট উদ্যোগই আজ সফল (Success Story) আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের বরেলির বাসিন্দা রিচা শর্মা নিজের হাতে তৈরি স্বাস্থ্যকর ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন ‘হাম্বল ফ্লেভারস’ নামে একটি সফল ব্র্যান্ড। কোনও ডিজিটাল মার্কেটিং বা বড়সড় বিজ্ঞাপন ছাড়াই শুধুমাত্র মানুষের মুখে মুখে প্রচারের জোরে তাঁর এই ব্যবসা এখন ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছে বিশ্বের ১৫টিরও বেশি দেশে। প্রতি মাসে ৫০০-র বেশি অর্ডার পূরণ করছে তাঁর সংস্থা। খাঁটি ঘি দিয়ে তৈরি লাড্ডু, মিলেট স্ন্যাকস এবং পুষ্টিকর খাবারের জন্য ইতিমধ্যেই বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয়েছে এই ব্র্যান্ডের।
রিচা শর্মার অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
রিচার জীবনযাত্রা কিন্তু শুরু থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ছিল না। রাজস্থানে বড় হওয়া রিচা ২০০৬ সালে জয়পুর থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি একটি মাইক্রোফাইন্যান্স সংস্থায় কাজ শুরু করেন এবং সেখানে ৭০ জনেরও বেশি কর্মীর একটি দল পরিচালনা করতেন। পরে ভাদোদরার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ২০১৬ সালে বিয়ের পর মুম্বাইয়ে চলে আসেন। কিন্তু ২০১৮ সালে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের পর তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। সন্তানদের সুস্থ ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি বাড়িতে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং লাড্ডু তৈরি করতে শুরু করেন। বাজারে প্রিজারভেটিভযুক্ত খাবারের বদলে ঘরোয়া এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প তৈরি করার লক্ষ্যই তাঁকে নতুন পথ দেখায়।
আরও পড়ুন: ভারতের প্রশংসা করে নিজেকে ‘মোদীর ফ্যান’ বললেন ট্রাম্প! কী জানালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট?
বন্ধু এবং পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার পর রিচা ২০১৯ সালে ‘রিচাস প্ল্যাটার’ নামে একটি ছোট উদ্যোগ শুরু করেন। প্রথমদিকে তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে আধুনিক সময়ে মানুষ আদৌ ঐতিহ্যবাহী খাবার কিনতে আগ্রহ দেখাবে কি না। কিন্তু মুম্বাইয়ের তাঁর আবাসনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অর্ডার নেওয়া শুরু হতেই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। বিশেষ করে গম ও ছোলার আটার তৈরি লাড্ডু দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সপ্তাহান্তে রান্নাঘরে শুরু হওয়া সেই ছোট ব্যবসা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। এরপর ২০২০ সালে কোভিড মহামারীর সময় যখন মানুষ স্বাস্থ্য এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে বেশি সচেতন হয়ে ওঠে, তখন রিচা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘হাম্বল ফ্লেভারস’ নামে ডাইরেক্ট-টু-কনজিউমার ব্র্যান্ড চালু করেন। সেই সময় স্বাস্থ্যকর এবং প্রিজারভেটিভ-মুক্ত খাবারের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা তাঁর ব্যবসাকে নতুন গতি দেয়।
চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রিচার ব্যবসাও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। মুম্বাইয়ের বাইরেও পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, কোয়েম্বাটুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসতে শুরু করে। ২০২১ সালে তাঁর স্বামী একটি ওয়েবসাইট চালু করেন, যার মাধ্যমে বিদেশ থেকেও অর্ডার আসা শুরু হয়। তবে দূরবর্তী এলাকায় লাড্ডু পৌঁছনোর সময় সেগুলি ভেঙে যাওয়ার সমস্যা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই সমস্যার সমাধানে রিচা অভিনব প্যাকেজিং পদ্ধতি তৈরি করেন। ডিমের ট্রের মতো গর্তযুক্ত ট্রে ব্যবহার করে তিনি এমনভাবে প্যাকেজিং শুরু করেন যাতে দীর্ঘ যাত্রাতেও লাড্ডুগুলি অক্ষত থাকে। বর্তমানে কোনও স্টক না রেখে অর্ডার পাওয়ার পরই প্রতিদিন তাজা খাবার তৈরি করা হয়। তাঁর সঙ্গে এখন আরও চারজন মহিলা কাজ করছেন, যারা এই ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছেন।

আরও পড়ুন: শিকে ছিঁড়ল সরকারি কর্মচারীদের! এক ধাক্কায় ৫% মহার্ঘ্য ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা করল রাজ্য সরকার
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই উদ্যোগ একটি লাভজনক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। রিচা জানান, তাঁর আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ উন্নত মানের কাঁচামালের পিছনেই ব্যয় হয়। এছাড়া শ্রমিকদের মজুরি, প্যাকেজিং এবং অন্যান্য খরচ বাদ দিয়েও তিনি ১৫ থেকে ২০ শতাংশ নিট লাভ করেন। শুধু ব্যবসাই নয়, সমাজের প্রতিও দায়িত্ববোধ রয়েছে তাঁর। মোট আয়ের ৫ শতাংশ তিনি ‘গুঞ্জ’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংস্থাকে দান করেন। ২০১৯ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত তিনি ১৫ হাজারেরও বেশি অর্ডার সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে তাঁর ৩৫০ জনেরও বেশি নিয়মিত গ্রাহক রয়েছেন। প্রথমদিকে বছরে যেখানে আয় ছিল মাত্র ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা, সেখানে এখন ‘হাম্বল ফ্লেভারস’-এর বার্ষিক টার্নওভার পৌঁছে গিয়েছে প্রায় ২৪ লক্ষ টাকায়। রাগি, মিলেট, মুগ ডাল, ভেগান এবং নতুন মায়েদের জন্য বিশেষ লাড্ডুর মতো পণ্যের মাধ্যমে রিচা প্রমাণ করেছেন, সঠিক পরিকল্পনা, গুণমান এবং নিষ্ঠা থাকলে ছোট উদ্যোগও সফলভাবে (Success Story) আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেতে পারে।













