বাংলাহান্ট ডেস্ক: গুজরাটের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে কোমল গণাত্রার সাফল্যের কাহিনি (Success Story) আজ হাজারো UPSC পরীক্ষার্থীর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। পণের অত্যাচার, সামাজিক অপমান, আর্থিক সংকট এবং সুযোগ-সুবিধার চরম অভাব, একাধিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেও তিনি প্রমাণ করেছেন, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনও বাধাই সাফল্যের পথে শেষ কথা হতে পারে না। আজ তিনি ভারতীয় রাজস্ব পরিষেবা বা আইআরএস (IRS)-এর একজন সফল আধিকারিক। তবে, এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, অসীম ধৈর্য এবং অদম্য মানসিক শক্তির এক অনন্য কাহিনি।
কোমল গণাত্রার অসাধারণ সাফল্যের কাহিনি (Success Story):
গুজরাটি মাধ্যমে পড়াশোনা করা কোমল ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ এতটাই ছিল যে তিনি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনটি পৃথক ভাষায় ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি রাজকোট গভর্নমেন্ট পলিটেকনিক থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা এবং বাবাসাহেব আম্বেদকর ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রিও লাভ করেন। ২০০৮ সালে তিনি গুজরাট লোকসেবা আয়োগের (GPSC) মেইনস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনিক পরিষেবায় প্রবেশের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়েই জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এক এনআরআই ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয় এবং ভবিষ্যতের নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়ে তিনি সিভিল সার্ভিসের চূড়ান্ত সাক্ষাৎকারে অংশ না নিয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আরও পড়ুন: ক্রমশ বাড়ছে জ্বালানির খরচ! এবার CNG-PNG-র দামে ফের বৃদ্ধি
কিন্তু বিয়ের মাত্র ১৫ দিনের মধ্যেই সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অভিযোগ, শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা যৌতুকের দাবিতে তাঁর উপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তাঁর স্বামী তাঁকে ভারতে একা রেখে নিউজিল্যান্ডে ফিরে যান। ভেঙে পড়লেও হার মানেননি কোমল। বাবার বাড়িতে ফিরে এলেও সেখানেও শান্তি পাননি। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের নানা কটূক্তি এবং সামাজিক অবহেলা তাঁর জীবনকে আরও কঠিন করে তোলে। অবশেষে তিনি নিজের শহর ছেড়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাসিক মাত্র ৫ হাজার টাকা বেতনে শিক্ষিকার চাকরি নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন।
গ্রামের সেই নির্জন পরিবেশেই কোমল নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তিনি স্থির করেন, সমাজের অপমানের জবাব কান্না দিয়ে নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁর সামনে চ্যালেঞ্জের শেষ ছিল না। যে গ্রামে তিনি থাকতেন সেখানে প্রায়ই বিদ্যুৎ থাকত না, ইন্টারনেটের কোনও সুবিধা ছিল না এবং UPSC প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় ইংরেজি সংবাদপত্রও নিয়মিত পৌঁছাত না। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। সপ্তাহের পাঁচ দিন স্কুলে পড়ানোর পর প্রতি শনিবার ও রবিবার প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আমদাবাদে কোচিং করতে যেতেন। এই কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও তিনি স্কুল থেকে একদিনও ছুটি নেননি। প্রথম তিনবার UPSC পরীক্ষায় ব্যর্থ হলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি। বরং প্রতিটি ব্যর্থতাকে শিক্ষায় পরিণত করে আরও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে প্রস্তুতি চালিয়ে যান।

আরও পড়ুন: চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা! চন্দ্রজয়ের লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে চিন
অবশেষে ২০১২ সালে তাঁর অধ্যবসায়ের ফল মেলে। চতুর্থ প্রচেষ্টায় UPSC পরীক্ষায় সর্বভারতীয় স্তরে ৫৯১তম স্থান অর্জন করেন কোমল গণাত্রা এবং ভারতীয় রাজস্ব পরিষেবার কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচিত হন। পরীক্ষার সময় তাঁর কেন্দ্র ছিল মুম্বইয়ে। স্কুলে দায়িত্ব পালন শেষে রাতভর ট্রেনে যাত্রা করে তিনি পরীক্ষা দিতে যান এবং পরীক্ষা শেষ করেই পরদিন আবার স্কুলে ফিরে পড়ানো শুরু করেন। এই ঘটনাই তাঁর নিষ্ঠা ও কর্মপ্রেমের প্রমাণ বহন করে। আজ কোমল গণাত্রার সাফল্যের গল্প (Success Story) শুধু একজন প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়ার গল্প নয়, বরং এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অদম্য লড়াই, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নপূরণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যা আগামী প্রজন্মকে বারবার অনুপ্রাণিত করবে।













