বাংলাহান্ট ডেস্ক: ভারতীয় নৌবাহিনীর নেতৃত্বে এল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। অবসর গ্রহণ করলেন নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল দীনেশ কুমার ত্রিপাঠী, আর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথন (Admiral Krishna Swaminathan)। শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের নতুন নৌসেনা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকবেন স্বামীনাথন। এমন এক সময়ে তিনি দায়িত্ব নিলেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আরব সাগরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা ভারতের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে তাঁর নিয়োগকে কেবল প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং কৌশলগত দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
দেশের নতুন নৌসেনা প্রধান হলেন কৃষ্ণ স্বামীনাথন (Admiral Krishna Swaminathan)
অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথনের নৌবাহিনীতে যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। সেই বছরই তিনি ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে তিনি নিজেকে দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৌশলগতভাবে পরিণত সামরিক আধিকারিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধবিদ্যায় তিনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। আধুনিক নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে এই দুটি ক্ষেত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, কারণ প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য আদানপ্রদান এবং শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করার ক্ষমতা অনেক সময় যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকেও স্বামীনাথনের প্রোফাইল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি দেশের অন্যতম প্রধান সামরিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমির প্রাক্তনী। পাশাপাশি আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের খ্যাতনামা নাভাল ওয়ার কলেজেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে ডিফেন্স স্টাডিজে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি মুম্বই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল ডিগ্রিও লাভ করেছেন তিনি। প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিষয়ে তাঁর এই উচ্চতর শিক্ষা ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্মজীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন অ্যাডমিরাল স্বামীনাথন। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর তিনি নৌবাহিনীর চিফ অফ পার্সনেল হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে তিনি ওয়েস্টার্ন নাভাল কমান্ডের প্রধানের দায়িত্বও সামলান। এর আগে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজের কমান্ডে ছিলেন। মিসাইল ভেসেল আইএনএস বিদ্যুৎ, আইএনএস বিনাশ, মিসাইল করভেট আইএনএস কুলিশ, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার আইএনএস মাইসোর এবং ভারতের গর্ব এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ার আইএনএস বিক্রমাদিত্যর নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব দায়িত্বে তাঁর সাফল্য এবং দক্ষ পরিচালন ক্ষমতা তাঁকে নৌবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে পৌঁছে দিয়েছে।
শুধু যুদ্ধজাহাজ পরিচালনাই নয়, নৌবাহিনীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং অপারেশনাল পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন স্বামীনাথন। একাধিক সামরিক মহড়া ও উচ্চপর্যায়ের প্রশিক্ষণে তিনি প্রধান পর্যবেক্ষক এবং পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। নৌবাহিনীর মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদারের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। ফলে অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়েই তিনি দেশের নতুন নৌসেনা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।

আরও পড়ুন: মিস হল ফ্লাইট, অথচ যাত্রীকে ৬৯,০০০ টাকা ক্ষতিপূরণ দিল ভারতীয় রেল! অবাক করবে পুরো ঘটনা
বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলেছে, যার প্রভাব আরব সাগর এবং হরমুজ প্রণালীতেও পড়ছে। এই অঞ্চলের সমুদ্রপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি পরিবহণ হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগে জলদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজ এবং সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষায় ভারতীয় নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এমন জটিল ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়েই নৌবাহিনীর নেতৃত্বে এলেন অ্যাডমিরাল কৃষ্ণ স্বামীনাথন (Admiral Krishna Swaminathan)। ফলে আগামী দিনে ভারতীয় নৌবাহিনীর কৌশল, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার দিকে নজর থাকবে দেশ-বিদেশের প্রতিরক্ষা মহলের।













