বাংলাহান্ট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে বারবার তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকটের মোকাবিলায় এবার দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত পদক্ষেপের পথে হাঁটতে চলেছে ভারত (India)। সূত্রের খবর, ওমান থেকে গুজরাট পর্যন্ত সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে কেন্দ্র সরকার। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি ভারতের পশ্চিম উপকূলে জ্বালানি সরবরাহ সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও যাতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই মেগা প্রকল্পের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
হরমুজের ওপরে নির্ভরতা কমাতে বড় পরিকল্পনা ভারতের (India)
প্রকল্পটি নতুন নয়। গত প্রায় তিন দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে এই পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিপুল ব্যয়, প্রযুক্তিগত জটিলতা এবং বাণিজ্যিক লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি। বর্তমানে SAGE নামে একটি বেসরকারি সংস্থা এই প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমীক্ষার কাজও এগিয়ে নিয়েছে। সমুদ্রতলে পাইপলাইন বসানোর জন্য সম্ভাব্য রুট চিহ্নিতকরণ এবং জরিপের কাজও সম্পন্ন হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি সফল হলে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে একটি নতুন জ্বালানি করিডোর তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে দেশের (India) জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওমানের রাস আল জিফান অঞ্চল থেকে আরব সাগরের তলদেশ দিয়ে গুজরাটের পোরবন্দর পর্যন্ত এই পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,০০০ মিটার বা তারও বেশি গভীরে পাইপলাইন বসানোর প্রস্তাব রয়েছে, যা প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই কাজ সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হলে প্রতিদিন প্রায় ৩১ থেকে ৫৬ মিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস সরাসরি ভারতে পরিবহণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে জাহাজের মাধ্যমে যে গ্যাস আমদানি করা হয়, তার তুলনায় এই ব্যবস্থায় পরিবহণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও নিরবচ্ছিন্ন হবে।
প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারি সংস্থা GAIL, Engineers India Limited এবং Indian Oil Corporation-কে। এই সংস্থাগুলি প্রযুক্তিগত, আর্থিক এবং বাণিজ্যিক দিকগুলি খতিয়ে দেখছে। ওমান সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলোচনা এবং সমীক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সূত্রের মতে, সমস্ত দিক সন্তোষজনক হলে দ্রুত নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্যে এগোনো হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তির বিষয়গুলিও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা সংকটের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে হরমুজে কোনও বাধা সৃষ্টি হলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলির উপর। অতীতে ভারতীয় জাহাজও বিভিন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ওমান সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার সমুদ্রতলের পাইপলাইন প্রকল্পকে বাস্তব রূপ দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। সফল হলে এটি শুধু ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাই নয়, গোটা অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত সমীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে ( India)।













