বাংলাহান্ট ডেস্ক: বিশ্ব রাজনীতি যখন যুদ্ধ, কূটনীতি এবং নির্বাচনী সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময় মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক বড় পদক্ষেপের দিকে এগিয়ে চলেছে চিন। পৃথিবীর তথাকথিত ‘দ্বিতীয় উপগ্রহ’ বা ‘কোয়াসি-স্যাটেলাইট’ 469219 Kamo‘oalewa-র উদ্দেশে পাঠানো তাদের Tianwen-2 মহাকাশযান এখন লক্ষ্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দাবি, আগামী জুলাই মাসেই এই মহাকাশযান গ্রহাণুটির পৃষ্ঠে অবতরণের চেষ্টা করবে। যদিও এখনও পর্যন্ত চিনের মহাকাশ সংস্থা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও বিবৃতি দেয়নি, তবুও জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের একাধিক রেডিও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র Tianwen-2-এর গতিবিধি নজরে রেখেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অভিযান সফল হলে তা শুধু চিনের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতির মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে পৃথিবীর এই ‘উপগ্রহে’ পদার্পণ করতে চলেছে চিনের মহাকাশযান Tianwen-2:
Kamo‘oalewa পৃথিবীর নিকটবর্তী এক রহস্যময় গ্রহাণু, যার আকার আনুমানিক ১৩০ থেকে ৩৩০ ফুটের মধ্যে। এটি পৃথিবীর চারপাশে এমনভাবে ঘোরে যে একে অনেকেই ‘দ্বিতীয় চাঁদ’ বা ‘অর্ধেক চাঁদ’ বলে উল্লেখ করেন। যদিও এটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে আবদ্ধ নয়, তবু তার কক্ষপথ পৃথিবীর সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্কিত যে সেটিকে পৃথিবীর এক বিশেষ সঙ্গী হিসেবেই ধরা হয়। বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, লক্ষ লক্ষ বছর আগে চাঁদের বুকে বড় কোনও উল্কাপাতের ফলে যে ধ্বংসাবশেষ মহাশূন্যে ছিটকে গিয়েছিল, Kamo‘oalewa সম্ভবত তারই একটি অংশ। এমনকি চাঁদের বিখ্যাত জিওর্দানো ব্রুনো গহ্বরের সঙ্গে এর উৎপত্তির সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও মনে করা হয়। ফলে এই গ্রহাণুর নমুনা হাতে পাওয়া গেলে চাঁদের অতীত সম্পর্কেও নতুন তথ্য মিলতে পারে।
আরও পড়ুন: নবান্নের বৈঠকে বড় চমক! বাংলার জল প্রকল্পে ৩৯ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ
২০২৫ সালের মে মাসে উৎক্ষেপণ করা হয় Tianwen-2 মহাকাশযান। সাম্প্রতিক ইঞ্জিন-বার্ন সম্পন্ন হওয়ার পর এটি Kamo‘oalewa-র গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তার সমান্তরাল অবস্থানে পৌঁছেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে মহাকাশযানটি গ্রহাণুটিকে প্রদক্ষিণ করবে এবং তার পৃষ্ঠের বিস্তারিত ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জুলাই মাসে এটি গ্রহাণুর গায়ে অবতরণ করবে। এরপর রোবোটিক বাহু এবং বিশেষ ড্রিল ব্যবস্থার সাহায্যে ধুলো, পাথর ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করা হবে। এই কাজের জন্য ‘টাচ অ্যান্ড গো’, ‘হোভার’ এবং ‘অ্যাঙ্কর অ্যান্ড অ্যাটাচ’— এই তিন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে চিন। এর আগে জাপানের Hayabusa-2 এবং মার্কিন মহাকাশ সংস্থা NASA-র OSIRIS-REx মিশনও অনুরূপ পদ্ধতিতে গ্রহাণু থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিল।
তবে Kamo‘oalewa-র ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। কারণ গ্রহাণুটি অত্যন্ত দ্রুত ঘূর্ণায়মান এবং তার পৃষ্ঠের প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। ফলে নমুনা সংগ্রহের কাজ সফল হবে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি নমুনা সংগ্রহ সম্ভব নাও হয়, কাছ থেকে তোলা উচ্চমানের ছবি এবং পর্যবেক্ষণ তথ্যই গবেষণার জন্য অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠবে। আর যদি নমুনা সংগ্রহ সফল হয়, তাহলে মহাকাশবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এই অভিযানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহ বা আরও দূরবর্তী মহাজাগতিক বস্তুর নমুনা সংগ্রহের প্রযুক্তিগত ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।

আরও পড়ুন: ৫ লক্ষ টাকার চিকিৎসা সুবিধা পেতে চান? আয়ুষ্মান কার্ডে এই ভুল করলেই বাতিল হতে পারে আবেদন
পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের শেষ দিকে Tianwen-2 পৃথিবীর কাছাকাছি ফিরে আসবে। সংগ্রহ করা নমুনা একটি বিশেষ ক্যাপসুলে ভরে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করানো হবে এবং সেটি মঙ্গোলিয়ার নির্দিষ্ট এলাকায় অবতরণ করবে। এরপর মহাকাশযানটি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণকে ‘গুলতি’ হিসেবে ব্যবহার করে আবার গভীর মহাশূন্যের পথে যাত্রা শুরু করবে। তার পরবর্তী গন্তব্য 311P নামের একটি ধূমকেতু, যেখানে ২০৩৫ সালের মধ্যে পৌঁছনোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, Tianwen-2 শুধু একটি বৈজ্ঞানিক অভিযান নয়, এটি মহাকাশ গবেষণায় চিনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। সফল হলে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চিন আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে, পাশাপাশি মানবজাতিও মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনের পথে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পাবে।

















