বাংলাহান্ট ডেস্ক: পুরাণে আমরা শত্রুর বিনাশে দুর্গা ও কালীর (Durga-Kali) আবির্ভাবের কথা তো সবাই শুনেছি। এবার বর্তমান যুগেও শত্রুদের শেষ করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে জোট বাঁধছে কালী ও দুর্গা। এখনকার যুদ্ধের ধরণ আগের থেকে অনেটাই পাল্টে গিয়েছে, এমনকি ভবিষ্যতেও সেই ধরণে আরও বদল আসবে। তাই প্রচলিত ট্যাঙ্ক, কামান কিংবা যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি এখন ড্রোন, হাইপারসনিক মিসাইল, ইলেকট্রনিক ও সাইবার যুদ্ধ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে ভারতও। সেই লক্ষ্যেই প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) এবং ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারের বিজ্ঞানীরা উন্নত ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন (Directed Energy Weapon বা DEW) প্রযুক্তির উপর কাজ করছেন। এই প্রযুক্তির আওতায় ‘কালী’ এবং ‘দুর্গা’ নামে দুটি অত্যাধুনিক অস্ত্রব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলির মূল উদ্দেশ্য শত্রুপক্ষের ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশপথের হুমকি দ্রুত নিষ্ক্রিয় করা। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের অনেক তথ্য এখনও গোপনীয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তার সব দিক প্রকাশ করা হয়নি।
শত্রুদের পরাস্ত করতে ভারতীয় সেননায় আসছে মোক্ষম মারণাস্ত্র দুর্গা-কালী (Durga-Kali):
এই দুই অস্ত্রের কার্যপদ্ধতি প্রচলিত গোলাবারুদ নির্ভর অস্ত্রের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এগুলি কাইনেটিক শক্তির পরিবর্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক বা লেজার শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ‘কালী’ (Durga-Kali) বা কিলো অ্যাম্পিয়ার লিনিয়ার ইনজেক্টর মূলত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রন অ্যাক্সিলারেটর প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালসের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ অচল করে দিতে সক্ষম বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থার কম্পিউটার সার্কিটকে ক্ষতিগ্রস্ত করে হামলার ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়াই এর প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি মহাকাশে থাকা উপগ্রহের ইলেকট্রনিক সিস্টেমের বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে।
আরও পড়ুন: একধাক্কায় মাইনে বাড়বে ১৯৮০০ টাকা? সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিরাট আপডেট
অন্যদিকে ‘দুর্গা’ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সলিড-স্টেট লেজার অস্ত্র হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। বর্তমানে ‘দুর্গা-২’ সংস্করণ নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে। এই অস্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল অটো-ফোকাস প্রযুক্তি, যা দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা ড্রোন, রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্রকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে লক্ষ্য স্থির করতে পারে। এরপর উচ্চক্ষমতার লেজার রশ্মির মাধ্যমে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকে আঘাত করা হয়। তুলনামূলকভাবে আকারে ছোট হওয়ায় এটি যুদ্ধ ট্যাঙ্ক, সাঁজোয়া যান, যুদ্ধজাহাজ কিংবা যুদ্ধবিমানে সহজেই সংযুক্ত করা সম্ভব। গোলাবারুদের প্রয়োজন না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। বিশেষ করে কম খরচের ড্রোন হামলা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তি এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে এবং বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে একাধিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ঘন কুয়াশা, ভারী বৃষ্টি, ধুলোঝড় বা অন্যান্য প্রতিকূল আবহাওয়ায় লেজার অস্ত্রের কার্যকারিতা কতটা বজায় থাকে, তা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। একইভাবে পাহাড়ি অঞ্চল বা প্রাকৃতিক বাধার আড়ালে থাকা লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ লেজার রশ্মি সরলরেখায় অগ্রসর হয় এবং প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে না। তাই প্রযুক্তির কার্যকারিতা আরও বাড়ানোর জন্য গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

আরও পড়ুন: কারও অ্যাকাউন্টে ৩ হাজার, কারও এখনও শূন্য! অনলাইন না অফলাইন, কোথায় আগে মিলছে অন্নপূর্ণার টাকা?
বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা পশ্চিম এশিয়ায় যে সাম্প্রতিক সংঘাত চলছে সেখানে ড্রোন নির্ভর হামলার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের যুদ্ধে শুধু আক্রমণাত্মক অস্ত্র নয়, দ্রুত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেই প্রেক্ষাপটে ভারত ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের প্রযুক্তি পরিপূর্ণভাবে কার্যকর হলে সীমান্ত নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা এবং কৌশলগত সম্পদ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ‘কালী’ ও ‘দুর্গা’ (Durga-Kali) নিয়ে প্রকাশ্যে যেসব দাবি করা হচ্ছে, তার অনেকগুলিই এখনও সরকারি ভাবে পূর্ণাঙ্গভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। তাই এই প্রকল্পকে ভারতের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও এর চূড়ান্ত সামরিক সক্ষমতা নির্ভর করবে সফল পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ মোতায়েনের ওপর।













