বাংলা হান্ট ডেস্ক: বর্তমান সময়ে ভারতীয়দের মধ্যে ক্রমশ ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ (Loan) নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মূলত,নিজের বাড়ির স্বপ্ন হোক কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ অথবা নতুন গাড়ি, বা বিয়ের জাঁকজমক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় পরিবারগুলি এখন ব্যাঙ্কের দ্বারস্থ হচ্ছে। প্রতি মাসে আয়ের একটি অংশ পরিশোধ করে নিজেদের শখ ও প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যেই মধ্যবিত্তরা দলে দলে ঋণ নিচ্ছেন। সম্প্রতি লোকসভায় উপস্থাপিত সরকারি তথ্য থেকে দেখা গিয়েছে যে, গত ৫ বছরে দেশে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং মাথাপিছু গড় ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হল: ভারতীয়রা (Indian) কেন তাঁদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি ঋণ নিচ্ছেন? সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রক রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India) এবং ট্রান্সইউনিয়ন CIBIL-কে উদ্ধৃত করে সংসদে অর্থ মন্ত্রক এই প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট উত্তর দিয়েছে। বর্তমান প্রতিবেদনে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপিত করা হল।
কোন কোন কারণে সবথেকে বেশি ঋণ (Loan) নিচ্ছেন ভারতীয়রা?
নিজের বাড়ির স্বপ্নই সবচেয়ে বড় খরচের কারণ: তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ব্যাঙ্কগুলির মোট ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ ৬৯,৩৯,৭৫০ কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। যার মধ্যে গৃহঋণের অংশই সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের মার্চে গৃহঋণের পরিমাণ ছিল ৩৩,৫৫,৯৬৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ব্যক্তিগত ঋণের প্রায় অর্ধেকই বাড়ি তৈরি বা কেনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। মাত্র ৪ বছর আগে অর্থাৎ ২০২২ সালের মার্চে, এই পরিমাণ ছিল ১৭,৩৮,৪৭৩ কোটি টাকা। এর মানে হল, গৃহঋণের বোঝা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর পরেই রয়েছে
‘অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণ’। অর্থাৎ কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়া নেওয়া ঋণ। যা ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ১৭,৩১,৮৩৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০২২ সালের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় দ্বিগুণ। এদিকে, যানবাহন কেনার জন্য নেওয়া ঋণও ৪ বছরে ৪ লক্ষ টাকা থেকে বেড়ে ৭,৩৮,৬৭৮ কোটি টাকা হয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষা ঋণও ৮৩,০০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১,৫৬,০০০ কোটি টাকা হয়েছে।

সোনার ক্ষেত্রেও ঋণে দ্রুত বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে: সরকারি তথ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে সোনার বিপরীতে নেওয়া ঋণে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে এই ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৪,৭৩৮ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৬১,৩৭৩ কোটি টাকায়। এটি প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি, যা অন্য যেকোনও খাতের চেয়ে দ্রুততর গতি পরিলক্ষিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, সোনার দাম বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক নগদ অর্থের প্রয়োজনের কারণে, মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে বাড়িতে রাখা গহনা বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়াকে সহজ ও সস্তা উপায় হিসাবে দেখছে।
আরও পড়ুন: ইথানলের ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকির ঘোষণা! কারা হবে লাভবান?
অন্যদিকে, বকেয়া ঋণ রয়েছে এমন ঋণগ্রহীতার সংখ্যাও একটি অবাক করা চিত্র তুলে ধরে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে উদ্ধৃত করে মন্ত্রক জানিয়েছে যে, ২০১৮ সালের মার্চ মাসে দেশের ১২.৮ কোটি মানুষের বকেয়া ঋণ ছিল। যা ২০২৫ সালের মার্চ নাগাদ বেড়ে ২৮.৩ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এর অর্থ হল, ৭ বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। এই সময়ে মাথাপিছু গড় বকেয়া ঋণের পরিমাণও ৩ লক্ষ ৪১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা হয়েছে।
চিন্তার কোনও কারণ নেই: তবে, এই চাঞ্চল্য কর পরিসংখ্যান সত্ত্বেও, সরকার সংসদকে আশ্বস্ত করেছে যে আতঙ্কিত হওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার জুন ২০২৬-এর আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্টের উদ্ধৃত করে মন্ত্রক জানিয়েছে যে, ভারতের অভ্যন্তরীণ ঋণ এখনও বেশিরভাগ উদীয়মান বাজারের অর্থনীতির তুলনায় কম। এছাড়াও, ভালো ক্রেডিট স্কোর অর্থাৎ ‘প্রাইম ও তার ওপরের ক্যাটাগরির ঋণগ্রহীতাদের অনুপাতও বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ইঙ্গিত দেয় যে বেশিরভাগ ঋণগ্রহীতা পরিবার তাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার দিক থেকে আগের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। সামগ্রিকভাবে, তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, বর্তমানে ভারতীয় পরিবার ঋণকে ভয় পায় না বা এটিকে লজ্জার বিষয় হিসেবেও দেখে না। বরং, বাড়ি কেনা থেকে শুরু করে সোনার চাহিদা মেটানো পর্যন্ত, ঋণ দৈনন্দিন আর্থিক পরিকল্পনার একটি স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। তবে, এই ভরসা টিকে থাকবে কি না, তা আগামী বছরগুলির পরিসংখ্যানই নির্ধারণ করবে।













