বাংলা হান্ট ডেস্ক : হোমমেকার শব্দটি কাদের জন্য প্রযোজ্য, এই বিষয়ে স্পষ্ট জানাল হাইকোর্ট (High Court)। চাকরি না করা বা সারাদিন বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে থাকা—এই দুটিই ‘হোমমেকার’ হওয়ার মাপকাঠি হতে পারে না। পরিবারের সদস্যদের দেখভাল, তাঁদের প্রয়োজন মেটানো, নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা না ভেবে সংসারের জন্য সময় দেওয়া—এই কাজগুলিরও মূল্য রয়েছে। দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি মামলায় এমনই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করল কর্নাটক হাই কোর্ট।
কী জানিয়েছে হাইকোর্ট (High Court)?
আদালত জানিয়েছে, একজন মানুষ পরিবারের দায়িত্ব পালন করলেই তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বা চাকরির অবস্থার ভিত্তিতে সেই পরিচয় অস্বীকার করা যায় না। এমনকি ‘হোমমেকার’ শব্দটিও কোনও একটি লিঙ্গের জন্য নির্দিষ্ট নয়। এই পর্যবেক্ষণের পিছনে রয়েছে এক মহিলার দীর্ঘ আইনি লড়াই। ২০১৩ সালের অক্টোবরে একটি পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর। বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা ওই মহিলা এর আগে একটি কলেজে গেস্ট লেকচারার হিসেবে কাজও করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের আগস্ট থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত শিক্ষকতা করে মাসে ৩৫ হাজার টাকা বেতন পেতেন তিনি। দুর্ঘটনার পর তাঁর শারীরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবিষ্যতে কাজ করে উপার্জন করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে সামনে রেখে কর্নাটক স্টেট রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি। কিন্তু পরিবহণ সংস্থার বক্তব্য ছিল, ওই মহিলা যথেষ্ট শিক্ষিত এবং দুর্ঘটনার সময় কোনও চাকরিতে ছিলেন না। তাই তাঁকে গৃহিণী বা ‘হোমমেকার’ হিসেবে ধরে ক্ষতিপূরণ হিসাব করা উচিত নয়।
প্রথম ধাপে মোটর অ্যাক্সিডেন্ট ক্লেমস ট্রাইব্যুনালও তাঁর আবেদন মেনে নেয়নি। ফলে ২০১৮ সালে হাই কোর্টে মামলা করেন তিনি। দুর্ঘটনার পর পরিবারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য ছিল, এই গৃহস্থালির শ্রমকেও আর্থিক মূল্য দিয়ে দেখা উচিত এবং সেই ভিত্তিতেই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
শুনানির সময় বিচারপতি চিল্লাকুর সুমলতা ‘হোমমেকার’ শব্দটির প্রচলিত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিচারপতি সুমলতার বক্তব্য অনুযায়ী, “প্রত্যেক মহিলা, যাঁরা পরিবারের সদস্যদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করেন, তাঁরাই হোমমেকার। শিক্ষাগত যোগ্যতা যাই হোক না কেন, পরিবারের জন্য পরিষেবা দিচ্ছেন, এমন প্রত্যেককেই হোমমেকার বলা যায়। একজন কর্মরত মহিলাও পরিবারের দেখভাল করলে তিনি হোমমেকার, একজন পুরুষও হতে পারেন হোমমেকার। শুধু ২৪ ঘণ্টা বাড়িতে থাকলে, নিরক্ষর হলে আর বাড়ির সব কাজকর্ম করলেই তিনি হোমমেকার নন।”
শুধু পরিবারের দৈনন্দিন কাজ নয়, পরিবারের সদস্যদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যে ব্যক্তিগত ত্যাগ করা হয়, সেটিকেও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছে কোর্ট। বিচারপতি আরও বলেন, “যিনি প্রতিনিয়ত সুখী পরিবারের পিলার হিসেবে কাজ করেন, পরিবারের জন্য নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেন, পরিবারকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসেন, তাঁরাই হোমমেকার।”
এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত ওই মহিলার দাবিকে স্বীকৃতি দেয় হাই কোর্ট। দুর্ঘটনার ফলে তাঁর শারীরিক অক্ষমতা এবং পরিবারের প্রতি তাঁর ভূমিকা বিবেচনায় তাঁকে ‘হোমমেকার’ হিসেবে ধরে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে। রায়ের অংশ হিসেবে মাসে ৮ হাজার টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এর পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির জন্য ১ লক্ষ ৭২ হাজার ৮০০ টাকা এবং চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার সময়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁর গৃহস্থালির পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় আরও ২৪ হাজার টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন : শেষ বড় DA সংশোধন! পে কমিশনের অপেক্ষার মাঝেই সরকারি কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি নিয়ে বড় খবর
সংসার সামলানোর কাজকে শুধুমাত্র ‘বাড়িতে থাকা’ হিসেবে দেখার বদলে তার পিছনে থাকা শ্রম, দায়িত্ব এবং ত্যাগকেও গুরুত্ব দিয়েছে আদালত। একইসঙ্গে ‘হোমমেকার’ পরিচয় যে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে, সেই বার্তাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই রায়ে।













