বাংলা হান্ট ডেস্ক : সরকারি প্রকল্পের টাকা প্রকৃত প্রাপকদের বদলে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে পৌঁছেছে এমন অভিযোগ উঠছে বহু জায়গায়। এবার প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা (Disability Allowance) একাধিক ব্যক্তিকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে সরগরম মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ। অভিযোগ পৌঁছেছে আইনি টানাপড়েনে। এবার এই মামলাতেই রাজ্য পুলিশকে দ্রুত তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। তদন্তে ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে ভুয়ো প্রতিবন্ধী শংসাপত্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য।
প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা (Disability Allowance) নিয়ে বেনিয়ম
ঘটনার সূত্রপাত সামশেরগঞ্জের বাসিন্দা সুরজ শেখের দায়ের করা জনস্বার্থ মামলা থেকে। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূল নেতা তথা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য আশিকুল ইসলাম প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত সরকারি আর্থিক সহায়তা নিয়ম ভেঙে একাধিক ব্যক্তিকে পাইয়ে দিয়েছে। মামলাকারীর দাবি, সরকারি সাহায্য পাওয়ার প্রকৃত দাবিদার বহু প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বছরের পর বছর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তাঁদের জায়গায় এমন কিছু মানুষের নাম সুবিধাভোগীর তালিকায় ঢুকেছে, যাঁরা আদৌ এই প্রকল্পের যোগ্য নন। জানা যাচ্ছে, আশিকুল ইসলাম নিজের প্রভাব খাটিয়ে পরিবারের সদস্যদেরও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য সরকারি নিয়মে বেশ কয়েকটি যোগ্যতার মাপকাঠি রয়েছে। আবেদনকারীর অন্তত ৪০ শতাংশ প্রতিবন্ধকতা থাকা আবশ্যিক। তার যথাযথ চিকিৎসাগত শংসাপত্রও প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁকে কমপক্ষে এক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে। পরিবারের বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকার বেশি হলে এই সুবিধা মিলবে না। একইসঙ্গে অন্য কোনও সরকারি ভাতার সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এই নির্দিষ্ট অনুদানের আওতায় আসতে পারেন না।
মামলাকারীর অভিযোগ, সামশেরগঞ্জে এই সমস্ত বিধিনিষেধ কার্যত উপেক্ষা করেই সুবিধা বণ্টন করা হয়েছে। আদালতে মামলাটি ওঠার পর অভিযোগের গুরুত্ব আরও বাড়ে পুলিশের দেওয়া তথ্য সামনে আসায়। তদন্তকারীরা বেশ কিছু প্রতিবন্ধী শংসাপত্র যাচাই করেন। মোট ১৫টি নথি পরীক্ষা করে ১৩টিকেই প্রাথমিকভাবে জাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে। এত অল্প সংখ্যক নথি যাচাইয়েই এত বেশি ভুয়ো শংসাপত্রের সন্ধান মেলায় গোটা ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মামলাকারীর আইনজীবী ওমর ফারুক গাজী শুনানিতে দাবি করেন, “যাঁরা সম্পূর্ণ সুস্থ এবং আইন অনুযায়ী যাদের এই সরকারি ভাতা পাওয়ার বিন্দুমাত্র অধিকার নেই, অসৎ উপায়ে সেইসব ব্যক্তিদের হাতে জনগণের করের টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।”
আশিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদমর্যাদা কাজে লাগানোর অভিযোগ তুলে আইনজীবী বলেন, “পঞ্চায়েত সমিতির দায়িত্বশীল পদে বসে আশিকুল ইসলাম ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। যেখানে একজন প্রকৃত প্রতিবন্ধী মানুষের এই সরকারি অনুদান পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে অত্যন্ত অমান্বিকভাবে নিজের পরিবারের সুস্থ স্বজনদের নাম তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন ওই প্রতিনিধি।”
রাজ্যের তরফে শুনানিতে জানানো হয়, অভিযোগ পাওয়ার পর বসে নেই প্রশাসন। ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৩৫(৩) ধারায় নোটিস জারি করা হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে কয়েকজনের বক্তব্যও রেকর্ড করা হয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি অতরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ মামলাটির নথি খতিয়ে দেখে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে। আদালতের মতে, আবেদনকারীর অভিযোগকে এই পর্যায়ে একেবারে অগ্রাহ্য করার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে যেহেতু পুলিশ ইতিমধ্যেই এফআইআর করে তদন্তে নেমেছে, তাই পুলিশ কীভাবে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায়, সেটিই পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছে আদালত।

আরও পড়ুন : দূরপাল্লার ট্রেনে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নয়া প্রযুক্তি! ঝকঝকে থাকবে কামরা…
হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ, যে শংসাপত্রগুলি ইতিমধ্যেই সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলির উৎস, তৈরির প্রক্রিয়া এবং সেগুলির ভিত্তিতে কারা সরকারি সুবিধা পেয়েছেন—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আসতে পারে। ফলে সামশেরগঞ্জের এই মামলায় পুলিশের তদন্ত শেষ হলেই উত্তর স্পষ্ট হতে পারে। আপাতত হাইকোর্টের কড়া নজর রয়েছে তদন্তের গতিপ্রকৃতির উপর।













