বাংলা হান্ট ডেস্ক: শেষবারের মতো চেয়েছিলেন ছেলেকে দেখতে। কিন্তু, সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি তাঁর। বৃহস্পতিবার না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন বাংলাদেশের চট্টগ্রামে জেলবন্দি হিন্দু সন্ন্যাসী চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের (Chinmoy Krishna Das) মা সন্ধ্যা রাণী ধর। এমতাবস্থায়, মাত্র ৫ ঘন্টার প্যারোলে তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছে আদালত (Bangladesh)। এদিকে, আবেদন সত্ত্বেও মৃত্যুুপথগামী মাকে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়ার বিষয়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। শুধু তাই নয়, এই প্রসঙ্গে গর্জে উঠেছেন বিশিষ্ট লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি একটি দীর্ঘ পোস্টে সামগ্রিক বিষয় উপস্থাপিত করে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন।
চিন্ময়কৃষ্ণের (Chinmoy Krishna Das) প্যারোল ‘রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্গ’, তারেকের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তসলিমার:
জানিয়ে রাখি যে, জীবিত অবস্থায় মায়ের সঙ্গে সন্তানের দেখা করার অনুমতি না দিয়ে মায়ের মৃত্যুর পর চিন্ময়কৃষ্ণের ৫ ঘণ্টার প্যারোলের বিষয়টিকে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্গ’ হিসাবে বিবেচিত করেছেন তসলিমা। তিনি তাঁর পোস্টের শুরুতেই জানান, ‘একজন মা মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের এর চেয়ে স্বাভাবিক মানবিক আবেদন আর কী হতে পারে? তিনি তাঁর সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন—মাত্র একবার, শেষবার। সন্ধ্যা রাণী ধর আর নেই। মৃত্যুর আগে তাঁর ইচ্ছা ছিল কারাগারে বন্দি ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে একবার দেখবেন। ছেলে এসে পাশে দাঁড়াবে, হয়তো তাঁর হাতটি ধরবে, হয়তো তিনি শেষবারের মতো ছেলের মুখের দিকে তাকাবেন। এতটুকুই।’
তসলিমা আরও লিখেছেন, চিন্ময়কৃষ্ণের মা শুধু তাঁর সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন, অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই সামান্য চাওয়াও পূরণ করতে পারেনি। এর পাশাপাশি, চিন্ময়ের দাদা গত ৯ সেপ্টেম্বরের প্যারোলের আবেদনের প্রসঙ্গও উপস্থাপিত করেন লেখিকা। যেখানে তিনি বলেন, ‘৯ সেপ্টেম্বর চিন্ময়ের বড় ভাই প্যারোলের আবেদন করলেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিন্ময়ের মুক্তি এবং তাঁর প্রতি মানবিক ও আইনগত সহযোগিতা চেয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলো। তাঁর মা যে সংকটাপন্ন, তিনি যে ছেলেকে শেষবার দেখতে চান—সেই কথাও সরকারের অজানা ছিল না।প্রশাসন জানিয়ে দিল, অসুস্থ মাকে দেখতে প্যারোল দেওয়ার বিধান নেই। মা মারা গেলে তখন নাকি শেষকৃত্যের জন্য কয়েক ঘণ্টার প্যারোল পাওয়া যেতে পারে। কী অসাধারণ রাষ্ট্রীয় যুক্তি! মা যতক্ষণ বেঁচে আছেন, ছেলে তাঁকে দেখতে পারবে না। মা মারা গেলে মৃতদেহ দেখতে যেতে পারবে। আইনের উদ্দেশ্য কী মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, নাকি মানুষকে অপমান করার জন্য আইনের অক্ষরকে ঢাল বানানো? পরদিন সকালেই সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেলেন। যে ছেলেকে তিনি শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন, তাকে আর দেখতে পেলেন না।’
এরপরই বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ছুঁড়েছেন তসলিমা। সম্প্রতি জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে তারেক জানিয়েছিলেন বাংলাদেশে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু ভাবনা সরিয়ে সবাই বাংলাদেশি। তবে, আবেদন সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মীয় নেতার মা মৃত্যুশয্যায় থেকেও কেন তাঁর ছেলেকে দেখতে পেলেন না সেই প্রশ্ন উপস্থাপিত করেছেন লেখিকা। এর পাশাপাশি, সন্ধ্যা রাণীর মৃত্যুসজ্জা বাংলাদেশ সরকারের পরীক্ষা ছিল বলেও বিবেচিত করেছেন তিনি। যেখানে সরকার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছেন তসলিমা।
আরও পড়ুন: ১৯ গোলে লজ্জার হার! ওমেন্স জুনিয়র এশিয়া কাপে ভারতের মেয়েদের কাছে ধরাশায়ী পাকিস্তান
উল্লেখ্য যে, নিজের পোস্টে চিন্ময়কৃষ্ণ দাসের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থার প্রসঙ্গ উত্থাপিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের কারণে তাঁর যে জামিন স্থগিত হয়ে যায় সেই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন তিনি। এমতাবস্থায়, নতুন সরকারের কাছে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান আদৌ ন্যায়সঙ্গত কিনা তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনার বিষয় তুলে ধরেন লেখিকা। সামগ্রিক ঘটনাটির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দু নাগরিক কী বার্তা পাচ্ছে এই প্রসঙ্গেও সরকারের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। পাশাপাশি, সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গও উপস্থাপিত করেন লেখিকা। যেখানে ধর্মের বিরুদ্ধে বৈষম্য-নিপীড়ন দূর করার কথা বলা হয়।
আরও পড়ুন: এশিয়ান গেমসের আগেই বড় ধাক্কা! ডোপ কেলেঙ্কারিতে ফের নাম জড়াল ভারতের, বাদ পড়লেন ৩ কুস্তিগির
নিজের পোস্টের শেষ অংশে তিনি লিখেছেন, ‘এই রাষ্ট্র কি এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে গেছে যে একজন মা মৃত্যুর আগে ছেলের মুখ দেখতে চাইলে সেই চাওয়াটুকুও রাষ্ট্রের কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে? এতটাই ভীত? এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ? এতটাই বিবেকশূন্য? ছি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র। ছি, এই নিষ্ঠুর প্রশাসন। ছি, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ আকুতির সামনেও নির্বিকার থাকতে পারে। একজন জীবিত মায়ের কাছে তাঁর সন্তানকে পৌঁছে দিতে পারেননি আপনারা। এখন আর কোনো ব্যাখ্যা, কোনো বিধি, কোনো সরকারি বিবৃতি এই দায় ধুয়ে দিতে পারবে না। সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেছেন। তাঁর শেষ ইচ্ছাটিও তাঁর সঙ্গে মারা গেছে। কিন্তু ছেলেকে শেষবার দেখতে না-পাওয়ার এই নিষ্ঠুরতা তারেক রহমান সরকারের গায়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক কলঙ্ক হয়ে থেকে যাবে। (জীবিত মাকে দেখতে প্যারোল দেওয়া হয়নি। মা মারা যাওয়ার পর তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য চিন্ময়কে পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হলো। এর চেয়ে নির্মম রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে?)’













