বাংলাহান্ট ডেস্ক: ৩ বছর আগেই BRICS (BRICS Summit 2026)-এর জন্য নাম নথিভুক্ত করতে চেয়েছিল পাকিস্তান (Pakistan)। তার সায়ও মিলেছিল চিনের তরফে। কিন্তু তবু কেন পাকিস্তান জায়গা পেল না এই মহামিলনপর্বে? সেক্ষেত্রে ইরান-আমেরিকা সংঘাতের উত্তাপ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহের মধ্যেই নয়াদিল্লিতে (New Delhi) বসেছে ১৮তম BRICS শীর্ষ সম্মেলন। বিশ্বের উদীয়মান শক্তিগুলির এই মঞ্চে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-সহ একাধিক রাষ্ট্রনেতাকে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নজর এখন কার্যত দিল্লির দিকে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের বাইরে রয়েছে ভারতের দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দুই দেশই এখনও BRICS-এর সদস্য নয়। এর মধ্যে পাকিস্তান বেশ কয়েক বছর ধরেই এই জোটে ঢোকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদের জন্য আবেদনও করেছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু এখনও সেই আবেদন নিয়ে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ব্রিকসে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক পাকিস্তান (Pakistan), তবু কেন যোগ দিতে পারল না?
পাকিস্তানের (Pakistan) BRICS-এ যোগ দেওয়ার আগ্রহের পিছনে শুধু কূটনীতি নয়, বড় অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং ঋণের বোঝার সঙ্গে লড়াই করছে ইসলামাবাদ। এই পরিস্থিতিতে BRICS-এর মতো একটি বড় অর্থনৈতিক মঞ্চে জায়গা পাওয়া পাকিস্তানের কাছে নতুন বাজার, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দরজা খুলে দিতে পারে। চিন ও রাশিয়ার কাছ থেকে পাকিস্তান সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছে বলেও বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু সদস্যপদের ক্ষেত্রে শুধু এক বা দুই দেশের সমর্থন যথেষ্ট নয়। BRICS-এর সম্প্রসারণে সদস্য দেশগুলির ঐকমত্য প্রয়োজন। ফলে ভারতের আপত্তি থাকলে পাকিস্তানের প্রবেশ কার্যত বড় বাধার মুখে পড়ে। সাম্প্রতিক রিপোর্টেও বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির বিরোধিতার কারণেই ইসলামাবাদের আবেদন এখনও এগোয়নি।
BRICS-এর বর্তমান গুরুত্ব বুঝলেই পাকিস্তানের এই আগ্রহের কারণ আরও স্পষ্ট হয়। ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলনে জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়। সৌদি আরবও আমন্ত্রিত হয়েছিল এবং বর্তমানে BRICS-এর সদস্য তালিকায় রয়েছে; অন্যদিকে আর্জেন্টিনা আমন্ত্রণ পাওয়ার পর শেষ পর্যন্ত যোগ দেয়নি। ইন্দোনেশিয়াও পরবর্তীতে জোটে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ১১টি দেশ BRICS-এর সদস্য এবং তারা সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা ও প্রায় ৪০ শতাংশ GDP-র প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে এটি শুধু রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ।
আরও পড়ুন: ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য ভারতের! ‘শত্রুতা’ ভুলে ব্রিকসে দিল্লি ঘোষণাপত্রে ঐক্যমত পোষণ সৌদি-ইরানের
ভারতের ক্ষেত্রেও BRICS-এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব গত কয়েক বছরে যথেষ্ট বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে BRICS দেশগুলির সঙ্গে ভারতের মোট পণ্য বাণিজ্য ৪১৭.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২০-২১ অর্থবর্ষের ২০৩.১ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই সময়ে BRICS দেশগুলিতে ভারতের রফতানি ৪৮.৮ শতাংশ বেড়ে ৬৪.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৯৫.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে পাকিস্তানের মতো একটি দেশও স্বাভাবিকভাবেই এই বাজার ও সহযোগিতার সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তবে একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত টানাপড়েন তাদের BRICS-এ প্রবেশের পথকে আরও কঠিন করে তুলছে।

আরও পড়ুন:বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ! হুথিদের নিয়ন্ত্রণে সমগ্র লোহিত সাগর, যেকোনও সময়ে বন্ধ হতে পারে বাব আল-মান্ডেব
এই পরিস্থিতিতে দিল্লিতে BRICS সম্মেলন যত বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে, পাকিস্তানের (Pakistan) বাইরে থাকা ততই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে। ইসলামাবাদ চাইছে উদীয়মান অর্থনীতির এই গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে। কিন্তু ভারতের আপত্তি এবং সদস্যদের ঐকমত্যের নিয়ম সেই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতত তাই চিন ও রাশিয়ার সমর্থন থাকলেও পাকিস্তানের জন্য BRICS-এর দরজা খোলার কোনও নিশ্চয়তা নেই। বরং নয়াদিল্লির অবস্থান স্পষ্ট—সদস্যপদের প্রশ্নে নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ-সহ বৃহত্তর কৌশলগত বিষয়গুলি উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে দিল্লিতে যখন BRICS-এর মঞ্চে বিশ্বের বড় শক্তিগুলি নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে, তখন সেই মঞ্চের বাইরে দাঁড়িয়েই পাকিস্তানকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।













