বাংলাহান্ট ডেস্ক: পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের উত্তাপ যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে, তখন দিল্লিতে BRICS (BRICS Summit 2026)-এর মঞ্চে কূটনীতির বড় পরীক্ষা দিল ভারত (India)। একাধিক মতপার্থক্য এবং আঞ্চলিক সংঘাতের চাপ সামলেও শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়েছে ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’ (New Delhi Declaration)। সেখানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি সর্বোচ্চ সংযম বজায় রাখা এবং এমন কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। বেসামরিক মানুষ ও পরিকাঠামোর সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রসংঘের সনদ মেনে সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মানের কথাও স্পষ্ট করা হয়েছে।
‘শত্রুতা’ ভুলে ব্রিকসে (BRICS Summit 2026) দিল্লি ঘোষণাপত্রে ঐক্যমত পোষণ সৌদি-ইরানের:
এই ঐকমত্য তৈরি করা যে একেবারেই সহজ ছিল না, তা বলাই বাহুল্য। কারণ BRICS (BRICS Summit 2026)-এর টেবিলে এমন দেশও রয়েছে, যাদের মধ্যে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘাত ঘিরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর অবস্থান একেবারেই অভিন্ন নয়। এর মধ্যেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলার প্রসঙ্গ জোরালোভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে আমিরশাহীও নিজেদের নিরাপত্তা ও ইরানের হামলার বিষয়টি সামনে রেখেছে। ফলে কোনও পক্ষকেই সরাসরি সমর্থন না করে এমন একটি ভাষা তৈরি করা প্রয়োজন ছিল, যাতে প্রত্যেক সদস্যই তাতে সম্মতি দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের বদলে সংযম, আলোচনা, কূটনীতি এবং বহুপাক্ষিক সমাধানের পথকেই সামনে রাখা হয়েছে। ভারতও বরাবর পশ্চিম এশিয়ার সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ! হুথিদের নিয়ন্ত্রণে সমগ্র লোহিত সাগর, যেকোনও সময়ে বন্ধ হতে পারে বাব আল-মান্ডেব
ঘোষণাপত্রের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে BRICS-এর সম্মিলিত অবস্থান। কোনও নির্দিষ্ট দেশের নাম না নিয়েই জঙ্গিবাদ এবং তার অর্থায়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। ফলে কূটনৈতিক মহলের একাংশ এই বার্তার মধ্যে পাকিস্তান-সহ সন্ত্রাসবাদে মদতদাতা শক্তিগুলির জন্য পরোক্ষ সতর্কবার্তা দেখছেন। একইসঙ্গে বাণিজ্যক্ষেত্রে একতরফা শুল্ক এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক বাধার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে BRICS। ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, এই ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকৃতি তৈরি করে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ায়। অর্থাৎ দিল্লির ঘোষণাপত্র শুধু যুদ্ধ বা নিরাপত্তা নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সবচেয়ে বড় তাৎপর্য অবশ্য ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকা ঘিরেই। এই সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদি একদিকে রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও চিনের শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে ইরান, উপসাগরীয় দেশ এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও ভারতের ভারসাম্যের নীতি ধরে রেখেছেন। BRICS-এর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে সবাইকে আনা নিঃসন্দেহে নয়াদিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য। তবে এটিকে কোনও পক্ষের সম্পূর্ণ পরাজয় বা ভারতের ‘মধ্যস্থতায়’ ইরান-আমিরশাহীর সব বিরোধ মিটে যাওয়া হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং কঠিন পরিস্থিতিতে ভিন্ন অবস্থানে থাকা দেশগুলিকে অন্তত একটি ন্যূনতম অভিন্ন অবস্থানে আনা—এটাই এই সম্মেলনের বড় সাফল্য।

আরও পড়ুন: আকাশে চপার-ড্রোন! সর্বত্র মোতায়েন শার্প শুটার, ব্রিকস ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা দিল্লিতে
এই কারণেই দিল্লির BRICS (BRICS Summit 2026) সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের নজর এতটা তীব্র। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চাপের মুখে ফেলার যে প্রচেষ্টা পশ্চিমা দেশগুলি চালিয়েছে, তার মধ্যেও BRICS নিজেদের আলাদা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মঞ্চ হিসেবে তুলে ধরছে। যদিও BRICS-কে সরাসরি ‘আমেরিকা-বিরোধী জোট’ হিসেবে দেখাতে চাননি প্রধানমন্ত্রী মোদি, তবু বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির প্রতিনিধিত্ব এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক চাপের বিরোধিতা নিয়ে জোটের অবস্থান যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে দিল্লির ঘোষণাপত্রকে শুধু একটি সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নথি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যুদ্ধের আবহে মতভেদ সামলে ঐকমত্য তৈরি করার এই প্রয়াস আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের বাড়তে থাকা ভূমিকারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি তুলে ধরেছে।













