বাংলাহান্ট ডেস্ক: মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) কারণে ভারতের (India) FMCG বাজারে এখন উদ্বেগের ছবি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা কমায় বড় থেকে ছোট—সব সংস্থারই চিন্তা বাড়ছে। NielsenIQ-এর ২০২৬ সালের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের রিপোর্টে উঠে এসেছে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে FMCG বাজারকে মূলত তিনটি বড় সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে—উৎপাদন ও ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধি, বাজারে মানুষের চলাচল ও কেনাকাটা কমে যাওয়া এবং গ্রামীণ এলাকায় আয় কমে যাওয়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিক্রিতে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ত্রৈমাসিকে প্রায় ৬৮ শতাংশ FMCG পণ্যের বিক্রি কমেছে। ইকোনমিক টাইমস-এর রিপোর্ট বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পণ্যের বিক্রির পরিমাণ ২ শতাংশ কমেছে। টাকার অঙ্কে বৃদ্ধিও মাত্র ০.৮ শতাংশ। অথচ বাজারদর বেড়েছে ২.৮ শতাংশ। অর্থাৎ দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে পণ্য কেনার পরিমাণ বাড়েনি, বরং খরচ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ কেনাকাটায় আরও হিসেবি হয়েছেন।
বাজারে মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) আতঙ্কের আবহে নিত্যপণ্যের কেনাকাটায় ৬৮ শতাংশের পতন:
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে গ্রামীণ বাজারে। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গ্রামাঞ্চলে FMCG পণ্যের বিক্রি প্রায় ৫ শতাংশ কমেছে। শহরের বাজার অবশ্য তুলনায় স্থিতিশীল থেকেছে, সেখানে বিক্রি মাত্র ০.১ শতাংশ বেড়েছে। এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। জুন মাসে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম হওয়ায় বহু জায়গায় চাষাবাদ ও বীজ বোনার কাজ পিছিয়ে যায়। একই সঙ্গে গ্রামীণ বেকারত্বের হার ৫.১ শতাংশে পৌঁছেছে এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও ০.৬ শতাংশ কমেছে। ফলে গ্রামীণ মানুষের হাতে খরচ করার মতো টাকা কমেছে। উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও মহারাষ্ট্র—এই সাত রাজ্যেই বিক্রি কমার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে। মোট পতনের প্রায় ৮৬ শতাংশই এই রাজ্যগুলিতে হয়েছে। তার উপর জুনে পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার ৯.৯ শতাংশ এবং খুচরো মূল্যবৃদ্ধি ৪.৪ শতাংশ থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে (Inflation)।

আরও পড়ুন: ফের ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেপালে! চোখের সামনে আচমকাই ভাঙল পাহাড়, মৃত কমপক্ষে ২৪
তবে শুধু মানুষের আয় কমা নয়, FMCG সংস্থাগুলির উৎপাদন ও সরবরাহের খরচও বেড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে ওঠায় পরিবহণ, প্যাকেজিং এবং অন্যান্য খরচে চাপ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে ছোট সংস্থাগুলি। ₹৫,০০০ কোটির বেশি বার্ষিক রাজস্ব থাকা সংস্থাগুলির বিক্রি কমেছে প্রায় ১ শতাংশ। সেখানে ₹১০০ কোটির কম রাজস্বের সংস্থাগুলির বিক্রি কমেছে ১০.৫ শতাংশ। বিশেষ করে ৫ থেকে ১০ টাকার ছোট প্যাকেট বা স্যাশে নিয়ে সমস্যা বেশি। কম দামের এই পণ্যগুলিতে উৎপাদন ও পরিবহণের খরচ বাড়লেও দাম সহজে বাড়ানো যায় না। ফলে সংস্থাগুলির লাভের মার্জিন ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, যা ছোট সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বড় চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, FMCG বাজারে ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাসেও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। দেশের মোট FMCG বিক্রির প্রায় ৮২ শতাংশ এখনও ঐতিহ্যবাহী মুদি দোকানের মাধ্যমে হলেও এই ত্রৈমাসিকে সেখানে বিক্রি ৬ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, আধুনিক খুচরো বিপণি বা বড় সুপারমার্কেটগুলিতে বিক্রি বেড়েছে ১৭.৫ শতাংশ। আরও দ্রুত এগিয়েছে ই-কমার্স। অনলাইন বিক্রিতে ৩৪.৮ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। শুধু বড় শহর নয়, Tier-2 এবং Tier-3 শহরেও অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে এবং সেখানে ই-কমার্সের বৃদ্ধি মেট্রো শহরের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। মেট্রো শহরগুলিতে আবার দ্রুত ডেলিভারি পরিষেবা বা কুইক কমার্সের দাপট বেড়েছে। মোট ই-কমার্স বাজারে কুইক কমার্সের অংশ ৭৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
সবচেয়ে চিন্তার বিষয় হল, বাজারের এই মন্দা এখন আর শুধু বিলাসবহুল বা কম জরুরি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রিতেও তার প্রভাব স্পষ্ট। খাদ্য ও পানীয়ের বিক্রি ১.১ শতাংশ কমেছে। গৃহস্থালি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের বিক্রি কমেছে ৪.৩ শতাংশ। OTC বা ওভার-দ্য-কাউন্টার পণ্যের বাজারেও একই ছবি—ইমিউনিটি বাড়ানোর পণ্যের বিক্রি ৯ শতাংশ, শিশু পরিচর্যার পণ্য ৬.২ শতাংশ এবং ত্বকের চিকিৎসা সংক্রান্ত পণ্য ৫.৫ শতাংশ কমেছে। ব্যথা, সর্দি ও কাশির ওষুধের বিক্রিতেও ৪.৩ শতাংশ পতন হয়েছে। সব মিলিয়ে NielsenIQ-এর পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যবৃদ্ধির চাপ কীভাবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কেনাকাটার সিদ্ধান্ত বদলে দিচ্ছে, তার প্রভাব এখন FMCG বাজারের প্রায় প্রতিটি স্তরেই স্পষ্ট (Inflation)।













