বাংলাহান্ট ডেস্ক: সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে ভারতীয় নৌসেনার (Indian Navy) হাতে এল নতুন যুদ্ধজলযান আইএনএস মঙ্গরোল (INS Mangrol)। অগভীর জলে চলাচল এবং শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজ শনাক্ত করে মোকাবিলা করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই জলযানটি আনুষ্ঠানিকভাবে নৌসেনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কেরলের (Kerala) কোচি শিপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত মঙ্গরোল এই শ্রেণির তৃতীয় জলযান হিসেবে বাহিনীতে যোগ দিল। সামরিক পরিভাষায় এই ধরনের জলযানকে বলা হয় ‘অ্যান্টি-সাবমেরিন ওয়ারফেয়ার শ্যালো ওয়াটার ক্রাফট’। উপকূলের কাছাকাছি অগভীর জলেও যাতে দ্রুত অভিযান চালানো যায়, সেই লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে এই শ্রেণির যুদ্ধজলযান। ফলে সমুদ্রের গভীর অংশের পাশাপাশি উপকূলবর্তী এলাকাতেও নজরদারি ও প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়বে ভারতীয় নৌসেনার।
ভারতীয় নৌসেনার হাতে এল নতুন যুদ্ধজলযান আইএনএস মঙ্গরোল (INS Mangrol):
মঙ্গরোলের অন্যতম বিশেষত্ব হল এর মাত্র ২.৭ মিটার ড্রাফট, অর্থাৎ জলরেখার নীচে জাহাজের যে অংশ ডুবে থাকে তার গভীরতা। বড় ফ্রিগেট বা ডেস্ট্রয়ারের পক্ষে অগভীর জলে চলাচল করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সেই তুলনায় মঙ্গরোলের (INS Mangrol) মতো ছোট যুদ্ধজলযান উপকূলের কাছাকাছি এলাকায় সহজে অভিযান চালাতে পারে। শত্রুপক্ষের ডুবোজাহাজের গতিবিধি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই এই জলযানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পাশাপাশি, উপযুক্ত অস্ত্রব্যবস্থার সাহায্যে শত্রুর বিমান ও হেলিকপ্টারের মোকাবিলা করার সক্ষমতাও রয়েছে এই শ্রেণির জলযানের। সব মিলিয়ে, উপকূলবর্তী সামুদ্রিক এলাকায় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে মঙ্গরোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
আরও পড়ুন: দেশজুড়ে জনপ্রিয়! রাসায়নিক প্রসাধনীর ভিড়ে আয়ুর্বেদেই হল বাজিমাত, কীভাবে সফল Vicco?
আধুনিক নজরদারি ও অস্ত্রব্যবস্থায় সজ্জিত এই জলযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম হল ‘অভয়’ হাল-মাউন্টেড সোনার। জলের নীচে শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে ডুবোজাহাজের অবস্থান শনাক্ত করতে সোনার প্রযুক্তি কাজে লাগে। এ ছাড়া রয়েছে হালকা টর্পেডো, দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অ্যান্টি-সাবমেরিন রকেট লঞ্চার এবং ‘মারিচ’ অ্যাডভান্সড টর্পেডো ডিকয় সিস্টেম। শত্রুপক্ষের টর্পেডোর আক্রমণ থেকে যুদ্ধজলযানকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই ডিকয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সেন্সর, অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মঙ্গরোলকে উপকূলবর্তী এলাকায় ডুবোজাহাজবিরোধী অভিযানের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। দেশীয় শিপইয়ার্ডে এই ধরনের জলযান নির্মাণ ভারতের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ভারতীয় নৌসেনার সামগ্রিক শক্তি বাড়ানোর পরিকল্পনাতেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে এই ধরনের ছোট যুদ্ধজলযান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে নৌসেনার হাতে ২০০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন রাখার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্যে স্টেলথ প্রযুক্তির ফ্রিগেট ও ডেস্ট্রয়ার, কর্ভেট, ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী জলযান এবং মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার কাজে ব্যবহৃত ‘মাইন কাউন্টারমেজার ভেসেল’ নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাবমেরিনের বহর বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। চিন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশকে ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেই এই প্রস্তুতি বলে মনে করা হচ্ছে। তবে শুধু বড় যুদ্ধজাহাজ নয়, উপকূলের অগভীর এলাকায় নজরদারি চালাতে সক্ষম জলযানও এই পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ভারতীয় নৌসেনার হাতে প্রায় ১৪০টি জলযান রয়েছে বলে দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে। এর মধ্যে ১৭টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন, যার ১১টি পুরনো। পাশাপাশি রয়েছে দুটি পরমাণুচালিত, পরমাণু অস্ত্রবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম এসএসবিএন এবং দুটি বিমানবাহী রণতরী। নৌসেনার আকাশপথের শক্তিও কম নয়—বাহিনীর হাতে ২৫০টিরও বেশি বিমান ও হেলিকপ্টার রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগামী এক দশকে জলযান ও আকাশযানের সংখ্যা প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে। সেই বৃহত্তর আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার মধ্যেই আইএনএস মঙ্গরোলের (INS Mangrol) অন্তর্ভুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। অগভীর জলে দ্রুত অভিযান, ডুবোজাহাজ শনাক্তকরণ এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার করার ক্ষেত্রে নতুন জলযানটি কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।














